রংপুরের বদরগঞ্জে সড়কে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করা অবৈধ বালুবহনকারী ট্রাক্টরের আতঙ্কে থমকে গেছে প্রাথমিক শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ। জীবনের ঝুঁকি ও দুর্ঘটনার ভয়ে স্কুলবিমুখ হয়ে পড়ছে কোমলমতি শিশুরা। প্রশাসনের নাকের ডগায় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতা ও অবৈধ বালু ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে বন্ধ হচ্ছে না এ মরণযজ্ঞ। ফলে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে শত শত শিক্ষার্থী।
জানা যায়, অরুন্নেছা-নাগেরহাট পাকা সড়কের পাশে অবস্থিত কুতুবপুর সোটাপীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাত্র একশ মিটার উত্তর দিকেই গড়ে উঠেছে দুটি অবৈধ বালুর পয়েন্ট। সেখান থেকে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ৩০-৪০টি অবৈধ ট্রাক্টর বিকট শব্দে বেপরোয়া গতিতে বালু পরিবহন করে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হায়দার আলী ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, বালুবাহী ট্রাক্টরগুলোর বেপরোয়া গতির কারণে জীবনের ভয়ে অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। গত কয়েক মাসে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী পুরোপুরি স্কুলবিমুখ হয়ে পড়েছে। তাদের চোখে-মুখে শুধুই আতঙ্কের ছাপ। তিনি এবং তার সহকারী শিক্ষক আ. বারী মিলে ওইসব শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এবং অভিভাবকদের মুঠোফোনে অনুরোধ করেও তাদের আর স্কুলমুখী করতে পারছেন না। একই চিত্র স্থানীয় কুতুবউদ্দিন কিন্ডারগার্টেনেরও। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মমিনুল আকন্দ অভিযোগ করেন, প্রতিদিন ভোর থেকে সড়কগুলো দখলে নেয় অবৈধ ট্রাক্টরগুলো। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও সবসময় দুর্ঘটনার চরম শঙ্কায় থাকেন।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবেদ আলী সাফ জানিয়ে দেয়, আমি আর স্কুলে যাব না। যে জোরে বালুর গাড়ি দৌড়ায়, তাতে খুব ভয় লাগে। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রোকসেনার বাবা বলেন, অনবরত যেভাবে বালুর গাড়ি চলে, সন্তান স্কুলে পাঠিয়ে বাড়িতে না আসা পর্যন্ত চরম চিন্তায় থাকি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওদের চলতে হয়। ভাবছি এ স্কুল থেকে নাম কেটে অন্য কোথাও ভর্তি করিয়ে দেব। স্কুলের এক সহকারী শিক্ষিকা জানান, অনবরত গাড়ির হর্ন ও বিকট আওয়াজে ক্লাসে শব্দদূষণ চরম আকার ধারণ করেছে, যা শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা দিচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যমুনেশ্বরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলার এ মহোৎসবের পেছনে রয়েছে বদরগঞ্জ উপজেলা ও স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। প্রতিদিন বালু বিক্রির মোটা অঙ্কের টাকার ভাগ চলে যায় ওইসব নেতাদের পকেটে। যার কারণে প্রশাসন চাইলেও শক্ত অবস্থানে যেতে পারছে না। সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য ফারুক মিয়া বলেন, অবৈধ বালু ব্যবসায়ীরা প্রশাসনকে তোয়াক্কাই করে না। বালু নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা অত্যন্ত দুর্বল হওয়ার কারণে নদী থেকে বালু তোলা বন্ধ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, ভাঙা জুম্মা গ্রামের বাসিন্দা খন্দকার মোস্তাফিজার জানান, সড়কে বালু ফেলায় প্রতিনিয়ত পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।
এ ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে বদরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দায়সারাভাবে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নাই। বদরগঞ্জ থানার ওসি হাসান জাহিদ সরকার বলেন, অবৈধ বালুর পয়েন্টগুলোতে অভিযান চালানোর দাবি করলেও স্থানীয়দের অভিযোগ পুরোপুরি ভিন্ন। কুতুবপুর, লোহানীপাড়া, মধুপুর ও রাধানগর ইউনিয়নের ধোলাইঘাটে অবৈধ বালু উত্তোলনের নৈরাজ্য কোনোভাবেই থামছে না। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, যমুনাশ্বরী নদীর তিন কিলোমিটারের মধ্যে বালুর বড় পয়েন্ট রয়েছে তিনটি। মিনি পয়েন্ট আছে দশটি। এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে দশ লাখ টাকার বালু বিক্রি হয়।
বদরগঞ্জ উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার কামরুজ্জামান মুঠোফোনে আমার দেশকে বলেন, অবৈধ বালুবাহী গাড়ি চলাচলের কারণে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতির সংখ্যা কমেছে। এসব অবৈধ বালুর পয়েন্টগুলো বন্ধ এবং বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনজুমান সুলতানার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

