আলু চাষে রসায়নিক ও কীটনাশক শূন্য টেকসই কৃষির এক সফল উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) একদল গবেষক।
গ্রানুলা (Granula) জাতের আলু চাষে প্রস্তাবিত ইউরিয়া ও ফসফেট সারের মাত্র ৫০ ভাগ ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফলন বা প্রচলিত চাষের মতোই ফলন পাওয়া গেছে। এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়ার একটি কার্যকর কনসোর্টিয়াম।
মাঠপর্যায়ে এই গবেষণা ও ফিল্ড ট্রায়াল পরিচালনা করেন হাবিপ্রবির কৃষি অনুষদের অন্তর্ভুক্ত বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল হক।
এই প্রকল্পের প্রধান গবেষক হিসেবে গবেষণার নকশা বাস্তবায়ন ও ফলাফল বিশ্লেষণে নেতৃত্ব দেন তিনি।

গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- এ পদ্ধতিতে নির্ধারিত কোনো ধরনের কীটনাশক, ছত্রাকনাশক বা হরমোন জমিতে স্প্রে করতে হয় না। সাধারণত আলু চাষে যেখানে ৮ হতে ১০ বার পর্যন্ত রাসায়নিক স্প্রে করতে হয়, সেখানে এন্ডোফাইটিক ব্যাকটোরিয়া ব্যবহারের ফলে সম্পূর্ণ স্প্রে করা ছাড়াই রোগমুক্ত ও উন্নতমানের আলু উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া ব্যবহারে উৎপাদিত আলুগাছের পাতা ও শিকড়ে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উদ্ভিদের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি মাটি ও উদ্ভিদের অভ্যন্তরে উপকারী অণুজীবের বৈচিত্র্য (microbial diversity) বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ পদ্ধতিতে আবাদকারী আলুচাষি কাহারোল উপজেলার সাইনগর (ঘুঘুর বাজার) গ্রামের দুলাল হোসেন বলেন, নতুন পদ্ধতি (এন্ডোফাইটিক
ব্যাকটেরিয়া) ব্যবহারের পর জমিতে কোনো স্প্রে করতে হয়নি। আমার খরচ কম হয়েছে। আর ফলনও ভালো হয়েছে।
চাষি দুলাল হোসেন আরো বলেন, সার কীটনাশক ব্যবহার করে এক বিঘা জমিতে আমার প্রায় ১০ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। আর নতুন এই পদ্ধতিতে আলু আবাদ করে এক বিঘা জমিতে দ্বিগুণ বা প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভ হয়েছে।
ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স প্রকল্পের সিনিয়র কর্মকর্তা নওসিন তামান্না বলেন, রিসার্চের আলু শুধু ওজনেই নয়, প্রাকৃতিকভাবে উপরের আবরণ বেশ শক্ত হয়েছে। আলু তোলার সময় আবরণ অক্ষত থাকে, এতে আলু যেমন বাজার উপযোগী থাকে তেমনি ৩-৪ মাস পর্যন্ত প্রাকৃতিকভাবে এই আলু সংরক্ষণ করা যায়। এটি খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বয়ে আনবে এক নতুন আশার আলো।
এ প্রযুক্তির উদ্ভাবক হাবিপ্রবির শিক্ষক ড. আজিজুল হক বলেন, এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল রসায়নিক ইনপুট কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে আলুচাষের লাভজনক একটি বিকল্প প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। মাঠপর্যায়ের ফলাফল প্রমাণ করে, এন্ডোফাইটিক ব্যাকরিয়া ব্যবহার করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণার ফলাফল সরাসরি জাতিসংঘের
টিকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (UN SDGs) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে-SDG 2 (ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব ও টেকসই কৃষি), SDG 12 (দায়িত্বশীল উৎপাদন ও ভোগ), SDG 13 (জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা), SDG 15 (স্থলজ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ)। এই প্রযুক্তি রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ দূষণ হ্রাস করে এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও কমায়।
উল্লেখ্য, এই গবেষণা প্রকল্পটি ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে, যা প্রান্তিক কৃষকদের জন্য পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গবেষকদের আশা, মাঠ পর্যায়ে বৃহত্তর পরিসরে পরীক্ষার মাধ্যমে এই ফলাফল নিশ্চিত করতে পারলে আলু চাষের পাশাপাশি অন্যান্য ফসল উৎপাদনেও এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক জৈব কৃষি প্রযুক্তি দেশের কৃষিতে একটি টেকসই পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

