একসময় গরমের দিনে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ছিল হাতপাখার কদর। বিদ্যুৎ না থাকলে কিংবা প্রচণ্ড গরমে স্বস্তি পেতে হাতপাখাই ছিল মানুষের অন্যতম ভরসা। একদিকে সময়ের সঙ্গে বৈদ্যুতিক ফ্যান, চার্জার ফ্যান ও প্লাস্টিকের পাখার ব্যবহার বেড়েছে। এতে কমেছে বাঁশের হাতপাখার চাহিদা। অন্যদিকে হাতপাখার কাঁচামাল বাঁশের দাম বেশি হওয়ায় লাভও কম হচ্ছে । ফলে ঐতিহ্যবাহী এ পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন বোচাগঞ্জের কয়েকটি পরিবারের কারিগররা।
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মালিপাড়া এলাকায় বাপ-দাদার আমল থেকে হাতপাখা তৈরি করে আসছেন রমেন (৩০) ও তার স্ত্রী কল্পনা (২৮)। এ এলাকায় আগে থেকেই পাঁচ-ছয়টি পরিবার এ পেশার সঙ্গে জড়িত। তবে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাতপাখার ব্যবহার কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে এ পেশার প্রতি আগ্রহও নেই।
রমেন জানান, বাপ-দাদার আমল থেকেই তাদের পরিবার হাতপাখা তৈরির কাজ করে আসছে। বর্তমানে স্বামী-স্ত্রীসহ পরিবারের চারজন এ কাজে যুক্ত। হাতপাখা তৈরির প্রধান কাঁচামাল বাঁশ। বাজার থেকে বাঁশ কিনে আনতে হয়। তবে প্রয়োজনীয় বাঁশ সহজে পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।
একটি হাতপাখা তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। দিনে গড়ে ৮ থেকে ১০টি হাতপাখা তৈরি করেন তারা। প্রতিটি হাতপাখায় বাঁশসহ কাঁচামালের খরচ পড়ে প্রায় ১০ থেকে ১৫ টাকা। পাইকারের কাছে প্রতিটি হাতপাখা ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি করেন। কাঁচামালের খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটি হাতপাখায় প্রায় ১৫ থেকে ২৫ টাকা থাকে। সব মিলিয়ে দিনে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা আয় হয় বলে জানান রমেন।
রমেনের স্ত্রী কল্পনা বলেন, সংসারের কাজের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর সঙ্গে হাতপাখা তৈরির কাজ করছেন। গরম বাড়লে কাজের চাপ বাড়ে এবং বিক্রিও কিছুটা বাড়ে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ চলে গেলে হাতপাখার চাহিদা বাড়ে। তবে আগের মতো সারা বছর এর চাহিদা নেই।
তিনি বলেন, আধুনিক ফ্যানের কারণে হাতপাখার ব্যবহার অনেক কমেছে। তারপরও সংসারের আয়ে কিছুটা সহায়তা করতে তারা এ কাজ ধরে রেখেছেন। কিন্তু বাঁশের দাম বেশি হওয়ায় লাভও কম।
কারিগররা জানান, অগ্রহায়ণ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত হাতপাখা তৈরির ও বিক্রির মৌসুম ভালো থাকে। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বাড়ে। তবে আগের তুলনায় এখন হাতপাখার বাজার অনেক ছোট হয়ে গেছে।
রমেন বলেন, ‘আগে হাতপাখার চাহিদা বেশি ছিল। এখন বৈদ্যুতিক ফ্যান, চার্জার ফ্যান ও প্লাস্টিকের পাখার কারণে বিক্রি কমেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা বাঁশ পাওয়া যায় না, পাওয়া গেলেও দাম বেশি। সরকারি কোনো সহায়তাও পাইনি। আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া গেলে এ কাজ ধরে রাখা সম্ভব। বাঁশ কাটার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পেলেও আমাদের উপকার হতো।’
এদিকে হাতপাখা তৈরির সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর সমস্যার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন উপজেলা প্রশাসন। বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ হাসান জানান, হাতপাখা তৈরির সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্ভাব্য সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের মতে, বিদ্যুৎ ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নানা ধরনের ফ্যানের ব্যবহার বাড়লেও গরমের সময় এবং বিদ্যুৎ চলে গেলে হাতপাখার প্রয়োজন এখনো রয়েছে। তবে কাঁচামালের সংকট, বাঁশের বাড়তি দাম, সীমিত বাজার ও নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে এ পেশা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কারিগরদের দাবি, প্রয়োজনীয় বাঁশ সহজলভ্য করা, আর্থিক সহায়তা এবং বাঁশ কাটার সরঞ্জাম দেওয়া হলে তারা এ পেশা ধরে রাখতে পারবেন। এতে কয়েকটি পরিবারের জীবিকার পাশাপাশি গ্রামবাংলার পুরোনো এ ঐতিহ্যও টিকে থাকবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


