অভিনব কায়দায় ইঁদুর দমন, রক্ষা পাচ্ছে কৃষকের ফসল

মন্জুর আলী শাহ, চিরিরবন্দর (দিনাজপুর)

অভিনব কায়দায় ইঁদুর দমন, রক্ষা পাচ্ছে কৃষকের ফসল
ইঁদুর মারার দেশি কৌশল। ছবি: আমার দেশ

দিনাজপুর চিরিরবন্দর উপজেলায় আমন ও বোরো ধান ক্ষেতে ইঁদুরে আক্রমণ ঠেকাতে কৃষকের একমাত্র ভরসা এখন ভ্যানচালক আসাদুজ্জামান।

আমন ধানের ক্ষেতে ইঁদুরের উপদ্রব নতুন নয়। ইঁদুরের কাছ থেকে ধানের জমি বাঁচাতে কৃষকেরা যুগে যুগে নানা কৌশল ব্যবহার করে আসছেন। বিষটোপ, পলিথিনের নিশানা, কলাগাছে লোহার তৈরি ফাঁদ ইত্যাদি ব্যবহার হয়ে আসছে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো সুফল মিলছে না। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার ভ্যানচালক আসাদুজ্জামান তার নিজস্ব চিন্তায় তৈরি করেন বাঁশের চোঙ্গা ফাঁদ, এর মধ্যে বেশ কয়েক বছর ধরে কৃষকরা আশ্রয় নিয়েছেন স্থানীয় প্রযুক্তি ‘বাঁশের চোঙা ফাঁদে’। এতে তারা দারুণ সুফল পাচ্ছেন। আর এই বাঁশের তৈরি চোঙা ফাঁদ দিয়ে ইঁদুর নিধনকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন চিরিরবন্দর উপজেলার সাইতারা ইউনিয়নের পূর্ব খোচনা গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে আসাদুজ্জামান। শুধু ইঁদুর মেরেই প্রতি সিজনে আয় আয় করছেন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।

amar desh

উপজেলার পলাশ বাড়ি গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে বোর ও আমন ধানের আবাদ করে আসছি। কিন্তু প্রতিবারেই ধান বের হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ধানগাছ কেটে ফেলে ইঁদুর।

বাজার থেকে বিভিন্ন নামিদামি কীটনাশক ব্যবহার করেও ইঁদুর থেকে ধানক্ষেত রক্ষা করা যায় না। অন্য কৃষকের মুখে শুনি যে আসাদুজ্জামান বাঁশের ফাঁদ দিয়ে ঈদুর ধরেন। তাই তাকে ডেকে একদিন ৩০টির বেশি ইঁদুর মারছি। আর ধান কাটছে না ইঁদুর। অনেক স্বস্তি পেয়েছি।

খোচনা গ্রামের আরেক কৃষক আরমান আলী জানান, আমাদের কৃষকের বন্ধু আসাদুজ্জামান তার তৈরি বাঁশের ফাঁদে ধানক্ষেতের ইঁদুর নিধনে কৃষকের স্বস্তি। না হলে প্রতি মৌসুমে ইঁদুরের হাত থেকে ধানক্ষেতের রক্ষা করা খুব কষ্ট হয়। ধানক্ষেত থেকে একটি ইঁদুর মারতে ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা নেয়। ধানক্ষেতে ইদুর আর আক্রমণ করতে পারে না। এতে ফসলের ফলন বাড়ছে আমাদের কৃষকদের।

ইঁদুর নিধনে বাঁশের তৈরি ফাঁদ তৈরি করে আলোড়ন সৃষ্টি করা আসাদুজ্জামান বলেন, প্রথমে আমার নিজের ধানক্ষেতে ইঁদুর মারার জন্য বাঁশের ফাঁদ তৈরি করি। প্রথম দিকে ফাঁদে ইঁদুর আটক কম হয়। কোনো দিন ইঁদুর আটক হতো আবার কোনো দিন ইঁদুর ফাঁদ থেকে বের হয়ে যেত। পরে বাঁশের ফাঁদটি নিয়ে বেশ কয়েবার গবেষণা করে ফাঁদের ডিজাইনটা পাল্টে ফেলি, এখন প্রতি ধানের মৌসুমে ৩ থেকে ৪ হাজারের বেশি ইঁদুর মারি।

ধানক্ষেতে ইঁদুর মারার জন্য বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে কৃষকরা ফোন করেন। কৃষকরা বলেন, আমার ধানক্ষেত ইঁদুর শেষ করে দিচ্ছে। আপনি একদিন সময় করে ইঁদুর মেরে দেন। কিন্তু আমার দূরে যাওয়ার সময় হয় না। আমার উপজেলার বিভিন্ন কৃষকের জমি থেকে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৭০টি পর্যন্ত ইঁদুর মেরে দেই।

আমি ভ্যানচালক। পাশাপাশি কৃষকের ধান ক্ষেতের ইঁদুর মেরে দেই। প্রতিটি ইঁদুর মেরে কেউ ৩০, ৪০ আবার কেউ ৫০ টাকা দেয়। এভাবে সিজনে ৪৫-৫০ হাজারের বেশি টাকা আয় করি।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিনহাজুল ইসলাম নবাব বলেন, বোরো ও আমন ধানের আবাদ ইঁদুরের হাত থেকে কৃষককে বাঁচাতে কৃষকের ভরসা এখন আসাদুজ্জামান। এই বাঁশের তৈরি ফাঁদে প্রতি বছর তিন থেকে চার হাজার ইঁদুর মারা যায়। এ পর্যন্ত তিনি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার ইঁদুর মেরেছেন। ইঁদুর মারার জন্য কৃষি বিভাগ থেকে তাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। আমরা কৃষি বিভাগ আশা করছি, তিনি জাতীয় পর্যায়ে ইঁদুর মারার জন্য পুরস্কৃত হবেন।

আমরাও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি, ইঁদুর মারার জন্য কীটনাশক ব্যবহার না করে বাঁশের তৈরি ফাঁদ ব্যবহার করুন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার জোহরা সুলতানা বলেন, ফসলের জন্য যে কয়েকটি বালাই রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম ইঁধুর। আমরা জানি, ইঁদুর একটি চালাক প্রাণী। ইঁদুরকে দমন করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ফসলের ক্ষেতে ইঁদুর নিধনের জন্য আমরা বিভিন্ন সময় বিষটোপসহ বিভিন্ন ফাঁদ দেখি। তবে মাঠ পর্যায়ে সবচেয়ে কার্যকর হচ্ছে বাঁশে তৈরি ফাঁদ। কৃষকরা বাঁশের তৈরি ফাঁদ দিয়ে ঈঁদুর নিধন করে নিজেদের ফসল রক্ষা করছেন। আমরা কৃষকদের এ বিষয় বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন