ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন

আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটে রৌমারীর নদীপাড়ের মানুষের

নাজিম আহমেদ, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)

আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটে রৌমারীর নদীপাড়ের মানুষের
কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি। আমার দেশ

কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ১৮ দিনে বিলীন হয়েছে প্রায় শতাধিক হেক্টর আবাদি জমি। ভাঙনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয়েছে সাত শতাধিক পরিবার। তারা এখন নিঃস্ব। ভাঙনের মুখে রয়েছে শত শত পরিবার। এছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদ গিলে ফেলেছে সুখেরবাতি আদর্শগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর গেন্দার আলগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙনের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন তীরবর্তী মানুষজন।

জানা গেছে, প্রায় ১০ মাসে উপজেলার চরশৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতি, চর গেন্দার আলগা, সোনাপুর, পশ্চিম খেদাইমারী, ঘুঘুমারী ও নামাজের চর এলাকায় অন্তত ৭২০ পরিবারের বসতবাড়ি নদে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনকবলিত পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে রাস্তার ধারে, অন্যের জমিতে ঝুপড়িঘরে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছে। দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘুঘুমারীর বাসিন্দা স্বামীহারা রহিমা বেগমের তিন মেয়ে। সংসারে আয়-রোজগার করেন একমাত্র তিনি। ব্রহ্মপুত্র নদের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে তার বসতভিটা। বর্তমানে আশ্রয় নিয়েছেন ঘুঘুমারী রাস্তার পাশে। তিনি বলেন, ‘আমার কোনো জায়গাজমি ও ঘরবাড়ি নেই। কোনোমতে এখানে আশ্রয় নিয়েছি। কতদিন থাকতে পারব জানি না।’

ঘুঘুমারীর আরেক ভুক্তভোগী সরবেশ পাগলা বলেন, ‘আমার বউ ও মেয়ে দুজনেই প্রতিবন্ধী। তারপরেও বারবার বসতভিটা পরিবর্তন করা বড়ই কঠিন। গত দেড় বছরে তিনবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছি।’ সুখেরবাতির ফুলচান বলেন, ‘আমার ঘরবাড়ি চারবার নদীতে গেছে। এখন ঘুঘুমারী রাস্তার পাশে অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়ে আছি। নিজের বসতভিটা কেনার কোনো ক্ষমতা নেই। এখান থেকে সরিয়ে দিলে কোথায় ঠাঁই নেব জানি না। আমাদের দেখার কেউ নেই।’

চর গেন্দার আলগা এলাকার সুন্দরী খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী দীর্ঘদিন থেকে অসুস্থ, আয়-রোজগার নেই বললে চলে। এখন পর্যন্ত বসতবাড়ি ভেঙেছে পাঁচবার। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে যে জায়গায় যাই, কিছুদিন পর সেখান থেকেও সরিয়ে দেয়। খুব কষ্টে আছি।’

সুখেরবাতির আনজুয়ারা বলেন, ‘আমার স্বামী মারা গেছে অনেক দিন আগে। দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে প্রতিবন্ধী, মেয়ের বিয়ে দিলেও স্বামী অন্যত্র বিয়ে করেছে। তাই মেয়েকেও পালতে হয়। এত দুঃখ-কষ্টের মাঝে নদীভাঙনের শিকার হতে হচ্ছে বারবার।’ একই এলাকার বিধবা হাজেরা বেওয়া বলেন, ‘একটুখানি বসতভিটা ও ঘরটাও ভেঙে নদীতে গেছে। এখন পর্যন্ত ঘর ওঠাতে পারিনি। তাই এ সড়কের পাশে ঝুপড়ি বেঁধে আছি। দ্রুত ভাঙনরোধের কাজ চাই।’

ওই এলাকার কুরবান আলী মুন্সী পেশায় মসজিদের ইমাম। গৃহহীন হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন নানার জমিতে। দুশ্চিন্তা তাকে কুরে কুরে খায়, যদি সেখান থেকে অন্যত্র যেতে হয়। তার মতে, নদীভাঙনের জন্য সরকারি কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না।

চরশৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সমসের আলী বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ৭২০ পরিবারের তালিকা ইউপি চেয়ারম্যান একেএম সাইদুর রহমান দুলালের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে জরুরি কাজের জন্য বর্তমানে কোনো বরাদ্দ নেই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন