একের পর এক স্প্যানিশ আক্রমণ। কখনও ফেরান তোরেস, কখনও মিকেল ওয়ারজাবাল, কখনও আইমেরিক লাপোর্তে। কিন্তু প্রতিবারই যেন গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এক অদম্য প্রাচীর। ৪০ বছর বয়সী ভোজিনহা দু’হাত মেলে রুখে দিয়েছেন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের সব স্বপ্ন। তার অবিশ্বাস্য সাতটি সেভে ভর করে বিশ্বকাপে অভিষিক্ত কেপ ভার্দে ইতিহাস গড়েছে। আটলান্টায় স্পেনকে গোলশূন্য রেখে ছিনিয়ে নিয়েছে মূল্যবান এক পয়েন্ট।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে দুই নম্বরে থাকা স্পেন ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল নিয়ে খেলতে থাকে। অন্যদিকে ৬৭তম স্থানে থাকা কেপ ভার্দে নিজেদের অর্ধে গুটিয়ে থেকে রক্ষণ সামলানোর কৌশল বেছে নেয়। শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, আফ্রিকার দেশটির পরিকল্পনা ছিল স্পেনের আক্রমণের ঢেউ সামলে সুযোগ পেলে পাল্টা আক্রমণে ওঠা।
প্রথমার্ধে বলের দখলে প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য দেখায় স্পেন। পেদ্রি, রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজরা মাঝমাঠে বল ঘুরিয়ে আক্রমণ সাজালেও কেপ ভার্দের ঘন রক্ষণ ভাঙতে পারছিল না। ১৬তম মিনিটে পেদ্রির দূরপাল্লার শট সহজেই ধরে ফেলেন ভোজিনহা। এরপর ৩০ মিনিটে মার্ক কুকুরেয়ার ভলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
ম্যাচের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত আসে প্রথমার্ধের শেষদিকে। ৪১তম মিনিটে কুকুরেয়ার হেড থেকে বল পেয়ে মাত্র পাঁচ গজ দূর থেকে শট নেন ফেরান তোরেস। গোল প্রায় নিশ্চিত মনে হলেও বল গিয়ে লাগে ক্রসবারে। ফিরতি বলে ওয়ারজাবালের হেড দুর্দান্ত দক্ষতায় কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন ভোজিনহা। এরপর তোরেসের আরেকটি কাছ থেকে নেওয়া শট এবং লাপোর্তের শক্তিশালী হেডও ঠেকিয়ে দেন কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। তার বীরত্বেই গোলশূন্য অবস্থায় বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধেও একই চিত্র। ৪৮ মিনিটে লাপোর্তের পাস, ৫০ মিনিটে ওয়ারজাবালের হেড, ৫৮ মিনিটে ফাবিয়ান রুইজের প্রচেষ্টা; সবকিছুই ব্যর্থ করে দেন ভোজিনহা। তাকে সঙ্গ দিয়েছে কেপ ভার্দের সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগ।
এক ঘণ্টা পার হতেই স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে পরিবর্তনের পথে হাঁটেন। ৭১তম মিনিটে গাভির বদলে মাঠে নামানো হয় ইনজুরি থেকে সদ্য ফেরা তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালকে। ইয়ামাল নামার পর স্পেনের আক্রমণে কিছুটা গতি এলেও কাঙ্ক্ষিত গোল আর আসেনি। ৭৫তম মিনিটে তার তৈরি সুযোগ থেকে মিকেল মেরিনোর শটও রুখে দেন ভোজিনহা।
ম্যাচ যত শেষের দিকে গড়িয়েছে, স্পেন তত মরিয়া হয়েছে। ৮৩তম মিনিটে কুকুরেয়ার হেড, ৮৯তম মিনিটে ওয়ারজাবালের প্রথম স্পর্শের শট; সবকিছুই ব্যর্থ করে দেয় কেপ ভার্দের রক্ষণ। বিশেষ করে শেষের দিকে ডিফেন্ডার রবার্তো লোপেসের অসাধারণ ব্লক দলকে রক্ষা করে। নাটকীয়তা অবশ্য তখনও বাকি ছিল। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে কর্নার থেকে দিনেই বোরজেসের হেড সরাসরি স্পেন গোলরক্ষক উনাই সিমনের হাতে চলে না গেলে হয়তো বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি ঘটেই যেত।
শেষ পর্যন্ত ৯০ মিনিট শেষে স্কোরবোর্ডে গোলের সংখ্যা শূন্যই রয়ে যায়। কিন্তু ফলাফলটি ছিল কেপ ভার্দের কাছে জয়ের সমান। ম্যাচে স্পেন ২৭টি শট নিয়েও গোল করতে পারেনি, যার সাতটি ছিল লক্ষ্যে। স্পেনের প্রত্যাশিত গোলের পরিসংখ্যান ছিল ২.২৯, বিপরীতে কেপ ভার্দের মাত্র ০.৩০। তবুও ব্যবধান গড়ে দিতে পারেনি লা রোহারা।
আর সেই কারণের নাম ভোজিনহা। পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব শাভেসে খেলা ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক পুরো ম্যাচে সাতটি সেভ করে বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় গোলকিপিং প্রদর্শনী উপহার দেন। শেষ বাঁশি বাজার পর আবেগে ভেঙে পড়া ভোজিনহাকে ঘিরে সতীর্থদের উল্লাসই বলে দিচ্ছিল কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসে এই রাত কতটা বিশেষ।
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই শক্তিশালী স্পেনের কাছ থেকে পয়েন্ট কেড়ে নিয়ে কেপ ভার্দে শুধু একটি ড্র করেনি, তারা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে- ‘ব্লু শার্কস’ এবার শুধুই অংশ নিতেই আসেনি, ইতিহাস লিখতেও এসেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

