খানসামায় মাদকের ভয়াল থাবা, ঝুঁকির মুখে তরুণ প্রজন্ম

উপজেলা প্রতিনিধি, খানসামা (দিনাজপুর)

খানসামায় মাদকের ভয়াল থাবা, ঝুঁকির মুখে তরুণ প্রজন্ম
ছবি: আমার দেশ

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা এখন ভয়াবহ মাদক আগ্রাসনের মুখে। একসময় সীমিত পরিসরে থাকা মাদকের বিস্তার এখন বিষবৃক্ষের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের প্রতিটি স্তরে। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও চোলাই মদের মতো মরণনেশা সহজলভ্য হয়ে ওঠায় নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানরাও এতে জড়িয়ে পড়ছে। এতে সামাজিক স্থিতিশীলতা যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি চরম হুমকির মুখে পড়ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামে মাদক কারবারিদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে একের পর এক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না এই অবৈধ বাণিজ্য। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন কৌশলে আরও গভীরে শিকড় গেঁড়ে বসছে এসব চক্র।

বিজ্ঞাপন

খানসামা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি এলাকায় কোনো না কোনোভাবে মাদক ব্যবসা ও সেবনের সঙ্গে জড়িত চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, খানসামা সদরসহ বিভিন্ন এলাকা—পানুয়া পাড়া, মাদার পীর বটতলা, মনাগঞ্জ মোড়, জয়গঞ্জ আদর্শ গ্রাম, বাদশা বাজার হাই স্কুল মাঠ, কানামাটিয়া ব্রিজের মোড়, বিজয় বাজার, রামকলা বাজার, টংগুয়া, আঙ্গারপাড়ার সাবুদের হাট, সুবর্ণখুলি, মহিসা পাড়া, পাকেরহাট পেট্রোল পাম্প, পাকের শিশু পার্ক, ভেজালের মোড়, ছাতিয়ানগড়, বাবুরহাট, গোয়ালডিহি ইউনিয়নের মানিকগঞ্জ বাজার, ভুল্লারহাট, নলবাড়ি, ভাবকি ইউনিয়নের রাবার ড্রাম, কাচিনীয়া, খামারপাড়া, ডাঙ্গাপাড়া, চৌধুরীপাড়া, জমিদার নগর, পাঁচপীর বাজার, বোর্ডেরহাট, বল্লামের বাজার ও চেহেলগাজি বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা গ্রাহকদের কাছে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে। এতে অভিযান চালিয়েও অনেক সময় মূল কারবারিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের খোলামেলা পরিবেশ ও স্থানীয় সোর্স ব্যবস্থার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির খবর আগেই পেয়ে যায় চক্রগুলো। ফলে সহজেই মাদক সরিয়ে ফেলা সম্ভব হচ্ছে।

মাদক এখন আর কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নআয়ের মানুষ পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ইয়াবা ও গাঁজার ব্যবহার তরুণদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী, বেকার যুবক এবং উঠতি বয়সীদের একটি অংশ সহজেই এসব মাদকের নাগালে চলে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, তুলনামূলক বেশি দামের কারণে ফেনসিডিলের দিকে ঝুঁকছে কিছুটা বিত্তশালী শ্রেণি। অন্যদিকে ইয়াবা, গাঁজা ও চোলাই মদের কম দামের কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে এসব মাদকে।

গত এক বছরে খানসামা থানা পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের একাধিক অভিযানে বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী গ্রেপ্তার হয়েছেন। উদ্ধার করা হয়েছে গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। অনেককে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—খুচরা বিক্রেতারা ধরা পড়লেও মূল সিন্ডিকেটের হোতারা কেন বারবার আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে?

জাহিদ হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, “প্রতিবারই ছোটখাটো বিক্রেতারা ধরা পড়ে। কিন্তু যারা বড় চালান আনে কিংবা পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কম দেখা যায়। ফলে মাদক ব্যবসা বন্ধ না হয়ে নতুন করে আবার শুরু হয়।”

শিক্ষক আব্দুর রহমান লিটন বলেন, “মাদক শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি পরিবার ও পুরো সমাজকে ধ্বংস করে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি মাদক সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে। বর্তমানে শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে এ প্রবণতা বাড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

সমাজকর্মীরা বলছেন, মাদক বিস্তার এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়—এটি একটি সামাজিক সংকট। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি যুবসমাজকে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

খানসামা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল বাছেত সরদার বলেন, খানসামা উপজেলায় মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক তৎপরতার মাধ্যমে মাদক সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

তিনিও আরও বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও আরও কঠোরভাবে অব্যাহত থাকবে। কোনো মাদক কারবারিকেই ছাড় দেওয়া হবে না—আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং হবে বলেও জানান তিনি।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...