ঢাকাসহ দেশের পাঁচটি বিভাগ তাপপ্রবাহ বাড়লেও দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড় চৈত্র মাসে ঘন কুয়াশায় আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পঞ্চগড়ের আবহাওয়ার সাথে ভারতের দার্জিলিংয়ের আবহাওয়ার তেমন পার্থক্যই নেই বললেই চলে।
ভোরে ঘন কুয়াশার সাথে শীতল হাওয়া অনুভূত হচ্ছে। এমন অবস্থায় পঞ্চগড়ে বর্তমানে বিরাজ করছে এক অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতি।
যদিও আবহাওয়ার এমন বিচিত্র আচরণে স্থানীয়রা রীতিমতো বিস্মিত। অব্যাহত প্রকৃতির এই বৈরীতা মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রাকে ব্যাহত করে তুলেছে। বয়স্ক এবং শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগে। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন বাড়ছে সর্দি-কাশিসহ নিমুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা।
সাধারণত পঞ্চগড়ে ফেব্রুয়ারিতেই শীত বিদায় নিতে শুরু করে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে তেমন শীত থাকে না; কিন্তু এবার মার্চের শেষ দিকেও ভোররাত থেকে ঘন কুয়াশার সাথে হাল্কা শীত অনুভূত হচ্ছে। আর গত কয়েক দিনের আবহাওয়া দেখে স্থানীয়দের কাছে মনে হচ্ছে শীত যেন আবারো ফিরে আসতে শুরু করেছে।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) দিবাগত রাত থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত পঞ্চগড়ের পুরো এলাকা ছিল ঘন কুয়াশায় ঢাকা। ঘন কুয়াশার কারণে পঞ্চগড়-ঢাকা জাতীয় মহাসড়কসহ সব সড়কেই যানবাহনগুলো হেডলাইড জ্বালিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে।
শুধু তাই নয়, কুয়াশার চাদরে ঢেকে ছিল রাস্তাঘাট মাঠ-ফসলি জমি ও গাছপালা। কৃষিজমি ও ঘাসের ডগায় বিন্দু বিন্দু শিশিরকণা লক্ষ্য করা গেছে। পঞ্চগড়ে এপ্রিলের প্রথম ভোরেই যেন শীতের আমেজ।
এদিকে এ মৌসুমে হঠাৎ কুয়াশার কারণ সম্পর্কে তেঁতুলিয়া আবহাওয়া কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জীতেন্দ্র নাথ রায় বলেন, বায়ুমণ্ডলে আদ্রতা বৃদ্ধি এবং তাপমাত্রা কমে গিয়ে জলীয় বাষ্প দ্রুত ঘনীভূত হওয়াই মূলত এর প্রধান কারণ। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হয়ে ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি এসে শীতলতার সংস্পর্শে যখন আসে ঠিক তখনই জলীয় বাষ্প জমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়। আর এসবের মূল কারণ হচ্ছে দক্ষিণা বাতাস, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা, দিন এবং রাতের তাপমাত্রা কমে যাওয়া হঠাৎ বৃষ্টি হওয়া। যাকে স্টিম ফগ বা বাস্পীয় কুয়াশা বলে আখ্যা দেওয়া হয়।
এক প্রতিক্রিয়ায় পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা এলাকার ব্যবসায়ী ঈদীস আলী বলেন, ‘মার্চের শুরুর দিকে পঞ্চগড়ে দিনের তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছিল। শীতের প্রভাব প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু হঠাৎ করে গত কয়েক দিন ধরে পঞ্চগড়ে ভোর থেকে ঘন কুয়াশায় আকাশ ঢাকা থাকছে। মনে হচ্ছে নতুন করে আবার শীতের আগমনী বার্তা দিচ্ছে।’
পঞ্চগড় সদর উপজেলার তুলার ডাঙা এলাকা থেকে ভোরে ভ্যানে করে সবজি নিয়ে এসেছেন মোবারক আলী। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরেই ভোরে শীত অনুভূত হচ্ছে। তাই জ্যাকেট পরে ভ্যান চালাচ্ছি।’
শহরের কায়েতপাড়া এলাকার শামাস্ রায়হান হৃদি বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। শুক্রবার ভোরে ঘুম থেকে উঠেই দেখি চারিদিক ঘন কুয়াশায় ঢাকা। ছাদের ফুলের টবের গাছে জমে আছে শিশির বিন্দু। মনে হচ্ছে শীত যেন দরজায় কড়া নাড়ছে।’
পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মনোয়ারুল ইসলাম জানান, গত কয়েকদিন ঠান্ডা জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশু এবং বয়স্করা ভর্তি হচ্ছে বেশি। আবহাওয়ার এই বৈরীতার কারনে ঠান্ডা জনিত রোগবালাই বাড়ছে।
পঞ্চগড়ে শীত পড়লেও ঢাকাসহ দেশের পাঁচটি বিভাগে শুক্রবার (৩ এপ্রিল) থেকে এই তাপপ্রবাহের পরিধি বাড়ার আভাস দিয়েছে বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিম (বিডব্লিউওটি)।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার পাশাপাশি বরিশাল, রংপুর, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের কিছু এলাকায় নতুন করে তাপমাত্রা বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। ফলে এসব অঞ্চলে গরমের তীব্রতা বাড়বে।
সংস্থাটি জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, পাবনা, গোপালগঞ্জ ও নড়াইলে তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। অন্যদিকে নাটোর, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর, গাইবান্ধা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, ঢাকা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
বিডব্লিউওটি জানায়, চলমান তাপপ্রবাহ আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত থাকতে পারে। তবে এর মধ্যে দেশের কিছু এলাকায় বিক্ষিপ্ত বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, যা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে।
আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি এপ্রিলেই বঙ্গোপসাগরে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে এ মাসে তীব্র কালবৈশাখীসহ শিলাবৃষ্টির পাশাপাশি কয়েক দফায় তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠতে পারে ৪১ ডিগ্রিতে। এপ্রিল মাসের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এমন আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে রোদে না থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ এ সময় হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। পাশাপাশি ছায়াযুক্ত স্থানে থাকা এবং বেশি পানি ও তরল খাবার গ্রহণেরও পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

