‘কোথায় স্বর্গ/কোথায় নরক কে বলে তা বহুদূর/মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক/মানুষেতে সুরাসুর’। কবি শেখ ফজলুল করিমের এ মর্মস্পৃশী কবিতাটি ছোটবেলায় পড়েননি, এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সেই কবির স্মৃতি বিজড়িত লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনার গ্রামের বাড়িটি আজ অযত্নে-অবহেলা আর সংস্কার না হওয়ায় অতীত ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কবি স্মৃতি পাঠাগারের পাশ দিয়ে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক থেকে নেমে যাওয়া সড়ক ধরে ভেতরের দিকে খানিকক্ষণ হাঁটলেই ‘কবিবাড়ি’। বাড়ির উঠানের একপাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন শেখ ফজলল করিম। টিনশেডের আধাপাকা বাড়ির একটি কক্ষে এখনো রয়েছে কবির কিছু স্মৃতিচিহ্ন, যেগুলো যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে প্রায় নষ্টের উপক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে রয়েছে কবির ব্যবহৃত চেয়ার, খাট, ব্যবহৃত টুপি, দোয়াত-কলম, ছোট্ট একটি কুরআন শরিফ।
কবির টানে প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটক ছুটে এলে বাড়িতে থাকা কবির একজন নাতবউ কিছু সময়ের জন্য ঘরটি খুলে দেন। সেখানে নেই দূরদূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের জন্য সামান্য বসার ব্যবস্থাটুকুও। কবির স্মৃতি বা বাড়িটি দেখভালের মতো সেখানে উল্লেখযোগ্য তেমন কেউ নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা সাবেক স্কল শিক্ষক মফিজুল হক বলেন, ‘লালমনিরহাট জেলার গর্ব কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতি রক্ষায় এখনই সরকারি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পাঠাগারটি যেমন নতুন করে চালু করা দরকার, তেমনি প্রয়োজন একটি জাদুঘর তৈরি করা।
কথা হয় কালিগঞ্জ উপজেলার বিশিষ্ট ব্যবসাযী আবু তালেব মিলুর সঙ্গে তিনি বলেন, ‘কবির তিন প্রজন্ম শেষ হয়ে গেছে এ জন্য স্মৃতি রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ খুবই প্রয়োজন। এ ছাড়া কবির ম্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি সংস্কারের অভাবে আজ অযত্ন-আর অবহেলায় ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। তিনি এটি দ্রুত সংস্কারের দাবি জানান।
কথা হয় কবির বাড়ির পুকুর পাড়ের বসে থাকা কোরবান আলী (৭০) সঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,কবির জন্ম ও মৃত্যু দিবসে স্থানীয়ভাবে মাঝে-মধ্যে হয়তো ছোটখাটো কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এরপর কেউ আর খবর রাখেন না। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো একদিন তার চিহ্ন হারিয়ে যাবে।’
শেখ ফজলল করিম ১২৮৯ বঙ্গাব্দের ৩০ চৈত্র, ইংরেজি ১৮৮৩ সালের ১৪ এপ্রিল, লালমনিরহাট জেলা) কালিগঞ্জ উপজেলার কাকিনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাক নাম ছিল মোনা। বাবা আমীরউল্লা সরদার আর মা কোকিলা বিবি। গ্রামের লোকজন তাকে ডাকত ‘কবি সাইব’ বলে।তার দাদা ছিলেন জশমতউল্লা সরদার। তিনি ছিলেন কাকিনা রাজবংশের একজন খ্যাতিমান কর্মকর্তা।
ফজলল করিমদের পরিবার ছিল একান্নবর্তী। মানে আত্মীয়পরিজন মিলে এক বিশাল পরিবার। বনেদি পরিবারের বাড়ির আদল যেমন হয়, তেমনি ছিল ফজলল করিমের পৈতৃক বাড়ি। সেই বাড়ির প্রশস্ত কাছারি ঘরের মাঝামাঝি একটি বিরাট বড় টেবিল ছিল। তাতে থাকত শৌখিন দোয়াতদান ও পাখার নানা রকম কলম। তখনকার দিনে পাখার কলমে লেখার প্রচলন বেশ জনপ্রিয় ছিল।
এই বিরাট টেবিলেই, ঝকঝকে লণ্ঠনের আলোয় পড়াশোনা করতেন কবি শেখ ফজলল করিম। লিখতেনও এখানেই। মধ্যরাত পর্যন্ত বিরামহীনভাবে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ ছিলেন তিনি। বয়স ৫ বছর হতে না হতেই তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে স্কুলে ছুটে যেতেন। পরে তাকে কাকিনা ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়।
পঞ্চম শ্রেণিতে উঠলে তাকে রংপুর জেলা স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এরপর কিছুদিন তিনি ঘরেই শিক্ষাগ্রহণ করেন। পরে আবার ভর্তি হন কাকিনা স্কুলে। সেখান থেকেই ১৮৯৯ সালে মাইনর পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। মাইনর পাসের পর তিনি পুনরায় রঙ্গপুর জেলা স্কুলে ভর্তি হন।
প্রথমে তার ইচ্ছে ছিল ডাক্তারি পড়ার। সে জন্য তিনি কাকিনা গভর্নমেন্ট ডিসপেনসারির ডাক্তার সরদাচরণ মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের অধীনে পড়তেও শুরু করেন। ডাক্তারখানায় অনুশীলনও করতেন। কলকাতার কম্বেল স্কুলে পড়তে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তখন কলকাতায় প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়লে, তার বাবা তাকে আর কলকাতায় যাওয়ার অনুমতি দেননি।
৫৪ বছরের জীবনকালে তার রচনার সংখ্যা নেহাত কম না। তার প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত মোট ৫৫টি বইযের সন্ধান পাওয়া গেছে।
বাংলার নিভৃত পল্লির এই লেখক আজ নেই। তবে তার রচিত রচনাগুলো আজও বাংলা সাহিত্যে অমলিন। সংরক্ষণের অভাবে যার অনেকগুলোর এখন আর হদিস মিলছে না। বাংলা ১৩২৩ সনে ভারতের নদীয়া সাহিত্য পরিষদ তাকে সাহিত্য বিশারদ উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৩৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কবি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগের পর অরক্ষিত হয়ে পড়ে আছে কবি শেখ ফজলল করিমের গ্রামের বাড়িটি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার সাংবাদিকদের জানান, কবি শেখ ফজলল করিমের কাকিনা গ্রামের বাড়ি সংস্কারের বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে বরাদ্দ এলেই বাড়িটি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

