পাটগ্রামের চার যুবককে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রির অভিযোগ

উপজেলা প্রতিনিধি, পাটগ্রাম (লালমনিরহাট)

পাটগ্রামের চার যুবককে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রির অভিযোগ

লালমনিরহাটের পাটগ্রামের চার যুবককে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে জামায়াতের সহযোগী যুব সংগঠনের দুই নেতা ও জামায়াতের পৌর আমিরের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে পাটগ্রাম থানায় চারটি মানব পাচার মামলা করেছে ভুক্তভোগী পরিবার । ঘটনার পর থেকে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে ওই চার যুবকের পরিবার চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, লালমনিরহাট জেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি উপজেলা যুব বিভাগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইউনুস আলী, পৌর যুব বিভাগের সাধারণ সম্পাদক মাহিন ইসলাম এবং পৌর জামায়াতের সভাপতি সোহেল রানা ইসলাম উচ্চ বেতনে গার্মেন্টের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনপ্রতি সাড়ে ৯ লাখ টাকা নিয়ে এ কাজ করেছেন। পরিবারগুলোর দাবি, ঢাকার উত্তরার আরএস ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১৪২৮) এজেন্সির মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠালে সেখানে নিরাপদ ও বৈধভাবে কাজের সুযোগ রয়েছে বলে জানানো হয়। পরে চার যুবকের পরিবারের কাছ থেকে ভিসা, টিকিট ও চাকরির ব্যবস্থা করার কথা বলে টাকা নেন তারা।

বিজ্ঞাপন

পরে গত ৪ মে পাটগ্রাম সদর ইউনিয়নের টেপুরগাড়ী এলাকার কৃষক দেলদার রহমানের ছেলে নাজমুল হক সৌরভ (২১), একই এলাকার কৃষক রাবিউল ইসলামের ছেলে মেহেদী হাসান (২১), একই ইউনিয়নের সর্দারপাড়া এলাকার কৃষক আফজাল হোসেনের ছেলে আল আমিন (২০) এবং একই এলাকার কৃষক আব্দুল মজিদের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে (২২) বাড়ি থেকে ঢাকায় নেওয়া হয়। গত ৭ মে রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার সময় বাহরাইন বিমানবন্দরে ১২ ঘণ্টার ট্রানজিট করা হয়। পরদিন ৮ মে সকালে তারা মস্কোর উদ্দেশে রওনা দেন। মস্কো পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর থেকে পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে স্বাভাবিকভাবে কথা হয় যুবকদের। পরে রুশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের একটি হোটেলে নিয়ে পাসপোর্ট, ভিসা ও মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়। তখন তারা জানতে পারেন, চাকরির পরিবর্তে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকেই তাদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

অভিভাবকরা জানান, পণ্য সরবরাহকারীর (ডেলিভারিম্যান) মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ছেলেরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজেদের জীবন ঝুঁকির কথা জানিয়েছে। পরে বিভিন্ন সময় ক্ষুদে বার্তায় পরিবারের কাছে জীবন বাঁচানোর আকুতি জানায় তারা।

পরিবারগুলোর দাবি, এ বিষয়ে ইউনুস ও মাহিনকে জানালে তারা প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, যুবকরা ভালো আছে এবং পরে ভিডিও কলে কথা বলবে। কিন্তু এরপর আর যোগাযোগ না হওয়ায় পরিবারগুলো আরো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

পরে ১৪ মে ভুক্তভোগী পরিবারের কয়েকজন সদস্য ঢাকার আরএস ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির কার্যালয়ে যান। সেখানে এজেন্সির লোকজন কয়েক দিনের মধ্যে যুবকদের নিরাপদ স্থানে নেওয়ার আশ্বাস দিলেও পরে কার্যালয়ে গিয়ে তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।

২১ মে ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সামনে পাটগ্রামের পরিবারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৩০টি পরিবার মানববন্ধন করে। এ সময় তারা তাদের সন্তানদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন।

নাজমুল হক সৌরভের বাবা দেলদার হোসেন বলেন, আমার ছেলেকে ইউনুস সাড়ে ৯ লাখ টাকা নিয়ে রাশিয়ায় পাঠিয়েছেন। এখন শুনছি সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। আমরা তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।

মেহেদী হাসানের বাবা রাবিউল ইসলাম বলেন, রাশিয়ায় ভালো চাকরির কথা বলে ইউনুস আমার ছেলেকে পাঠিয়েছেন। এখন ছেলের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। সে নিখোঁজ।

এ ঘটনায় পাটগ্রাম উপজেলা জামায়াতে ইসলামী অভিযুক্ত ইউনুস ও মাহিনকে গত ২০ মে উপজেলা ও পৌর যুব বিভাগের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে পাটগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে পৌর জামায়াতের আমির সোহেল রানাকেও দায়ী করা হয়।

অব্যাহতি পাওয়া উপজেলা যুব বিভাগের সভাপতি ইউনুস আলী বলেন, তারা বৈধ কাগজপত্র নিয়ে গেছে। সেখানে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছে। এজেন্সির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। দুদেশের দূতাবাসেও যোগাযোগ করা হয়েছে। সবাইকে নিরাপদ স্থানে আনার চেষ্টা চলছে।

তিনি আরো বলেন, পরিবারগুলোর কাছ থেকে যে টাকা নিয়েছি, সব মাহিনকে দিয়েছি। মাহিন এজেন্সিকে দিয়েছে।

অপরদিকে মাহিন ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পরিবারগুলোর সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় নেই। ইউনুসের সঙ্গে এজেন্সির পরিচয় থাকলেও পুরো কাজ সে নিজেই করেছে। এখানে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

পৌর জামায়াতের আমির সোহেল রানার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেলেও তিনি আওয়ামী লীগ আমলের হত্যা মামলার দায়ে জেলহাজতে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পাটগ্রাম উপজেলা জামায়াতের আমির হাফেজ শোয়াইব আহমেদ বলেন, এ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর কোনো দায় নেই। এটি ব্যক্তিগত বিষয়। সংগঠন ঘটনা জানার পর দুজনকে অব্যাহতি দিয়েছে।

পাটগ্রাম থানার ওসি নাজমুল হক বলেন, রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে চার যুবককে বিক্রির অভিযোগে থানায় চারটি মানব পাচার মামলা করা হয়। এতে ইউনুস, মাহিন ও রানাকে আসামি করেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। এ ঘটনায় আসামিদের আটক করতে কাজ করছে পুলিশ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...