মাদক মামলার আসামিকে বিদেশে যেতে সহায়তার অভিযোগ দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

মাদক মামলার আসামিকে বিদেশে যেতে সহায়তার অভিযোগ দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

মাদক ব্যবসায়ীর পক্ষে সাফাই গেয়ে এবং আসামির কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করে চার্জশিট থেকে নাম বাদ দিয়ে তাকে বিদেশে পালানোর সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর পক্ষে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রংপুর বিভাগীয় কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজিসহ সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগে বলা হয়, রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মাদক সম্রাট মোরসালিনের নামে মাদক মামলার চার্জশিটে ভুল কলামে নাম দিয়ে মোটা অংকের ঘুষ গ্রহণ করে পুলিশের পিসিপিআরে আসামিকে অব্যাহতি দেখিয়ে বিদেশ পালাতে সহযোগিতা করেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক দিলারা রহমান এবং উপ-পরিদর্শক মেহেদুল ইসলাম সরদার। বিদেশে পালিয়ে যাওয়া মাদক সম্রাট মোরছালিন মিয়া মিঠাপুকুর উপজেলার বালুচর কাশিনাথপুর এলাকার হাতিমপুর গ্রামের আব্দুল লতিফের ছেলে। মাদক ব্যবসা করে নিজ এলাকায় সুবিশাল বাড়ি ও কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি ক্রয়ের পাশাপাশি ঢাকায়ও কয়েকটি ফ্ল্যাট কিনেছেন।

অভিযোগকারী মুশফিকুর আমার দেশকে বলেন, মোরছালিন মাদক ব্যবসা করে পুরো এলাকা নষ্ট করে দিচ্ছে। এ কারণে মোরছালিন মিয়ার বিরুদ্ধে মিঠাপুকুর থানায় ৯ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় একটি মাদক মামলা হয়। এ মামলার তদন্ত ও চার্জশিট নিয়ে সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে গুরুতর কিছু অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, মামলার চার্জশিটে মোরছালিনের নাম আসামিদের জন্য নির্ধারিত কলামের পরিবর্তে অব্যাহতির জন্য ব্যবহৃত কলামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং পুলিশের পিসিপিআরেও তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে চার্জশিটে তার জীবিত পিতা আব্দুল লতিফকে মৃত দেখানোর বিষয়টিও প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

আরও জানা যায়, মোরছালিন গত ২১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ওমরার ভিসায় সৌদি আরব গেছেন। অথচ মোরছালিনের বিরুদ্ধে থাকা ৯ হাজার পিস ইয়াবার মামলায় গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আদালতে হাজিরার তারিখ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু তিনি আদালতে উপস্থিত হননি। পরবর্তীতে আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে জানা যায়, তিনি সৌদি আরবের মক্কায় ওমরা পালনের জন্য গেছেন মর্মে সময় প্রার্থনা করা হয়েছে। বিষয়টি পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি আদালতের কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় বিদেশে অবস্থান করছেন। তিনি কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, আদালতকে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না এবং তার বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি রাখে।

কারণ মাদক-সম্রাট মোরসালিন এত বেশি অর্থের মালিক যে গত ৯ আগস্টে তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও ছোট বোন মনোশি বেগমের নামে অর্ধ কোটি টাকা টাকা মূল্যের জমি ক্রয় (দলিল নম্বর ৮৫১২) করেছেন। এছাড়া মিঠাপুকুর উপজেলার বাজারে এলাকায় প্রায় অর্ধ কোটি টাকা মূল্যের আরো কিছু জমি বায়নাপত্র করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৮ জুলাই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের পরিদর্শক মোজাফফর হোসেন শাহ এর নেতৃত্বে একটি রেইডিং পার্টি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রাণীপুকুর জুমা খানপাড়া এলাকার মো. খালেদ খানের বসতবাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৮৭০ গ্রাম ওজনের ৯ হাজার পিচ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে খালেদ খানের স্ত্রী নাজমা বেগম (২৬) কে গ্রেফতার করে। এসময় ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতারকৃত নাজমা বেগমের স্বামী খালেদ খান ও মিঠাপুকুর থানার বালুচর কাশিনাথপুরের হাতিমপুর এলাকার আব্দুল লতিফের ছেলে মোরছালিন মিয়া (৩২) পালিয়ে যায়। এবিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ পরিদর্শক আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে মিঠাপুকুর থানায় একটি এজাহার দায়ের করেন।

আদালতে এই কর্মকর্তার দাখিলকৃত চার্জশিট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চার্জশিটের তিন নম্বর কলামে তদন্তে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের নামের জায়গায় অভিযুক্ত মাদক সম্রাট খালেদ খান ও মোরছালিন মিয়ার নাম না দিয়ে ২ নম্বর কলামে চার্জশীট থেকে আসামিদের অব্যাহতি দেয়ার কলামে নাম দিয়ে কৌশলে পুলিশের পিসিপিআর থেকে অব্যাহতি দেখানো হয় মোরছালিন মিয়া ও খালেদ খানকে। একই সাথে মামলার এজাহারে মোরছালিন মিয়া কক্সবাজার থেকে ৯ হাজার পিচ ইয়াবা এনে খালেদ খানের বাড়িতে মজুত করার বিষয়ে উল্লেখ থাকলেও আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে প্রধান মাদক কারবারি মোরছালিনকে মাদক বিক্রয়ে সহযোগিতা করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। একই সাথে মাদক সম্রাট মোরছালিন মিয়ার জীবিত পিতা আব্দুল লতিফকে চার্জশিটে মৃত দেখানো হয়েছে। অথচ কিছুদিন আগে তার বোনের নামে জমি কেনা হয়েছে সেখানে তার বাবাকে জীবিত দেখানো হয়।

অভিযোগে বলা হয়, কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মেহেদুল ইসলাম সরদার ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ পরিচালক দিলারা রহমানের যোগসাজশে মামলার চার্জশীটে মাদক সম্রাট মোরছালিন মিয়াকে অপেক্ষাকৃত হালকা অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে কৌশলে পুলিশের পিসিপিআরে মাদক মামলায় অব্যাহতি দেখিয়ে বিদেশ পালানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়।

গোপন সূত্রে জানা যায়, গত ২১ আগস্ট দুপুর সাড়ে ১২ টায় সানজিলা মুনতাসির ট্রাভেলস এ্যান্ড ট্যুর লিমিটেডের সহযোগিতায় ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইটে ওমরা ভিসায় সৌদিআরব গমন করেন মাদক সম্রাট মোরছালিন মিয়া। একই টিকিটে ওমরা শেষে ১৯ সেপ্টেম্বর ইউএস বাংলার ফ্লাইটে দেশে ফেরার কথা রয়েছে এই মাদকব্যবসায়ীর। তবে সৌদি আরবে পৌঁছেই স্থায়ীভাবে সেখানে অবস্থানের জন্য বিভিন্নভাবে তদবির করে যাচ্ছেন এই মাদক ব্যবসায়ী।

সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত মিঠাপুকুরের সিএসআই এ.এফ.এম সাখাওয়াত হোসেন আমার দেশকে বলেন, এই মামলার চার্জশিটের দুই নম্বর কলামটি অব্যাহতিপ্রাপ্ত আসামিদের কলাম। এই কলামে কোন আসামির নাম দিলেই সফটওয়্যারে অটোমেটিকালি ওই আসামিকে অব্যাহতি দেখাবে। মাদকদ্রব্যের এই মামলায় অব্যাহতির কলামে নাম দেয়ায় এই আসামিকে পুলিশের পিসিপিআরে মামলা থেকে অব্যাহতি দেখাচ্ছে। এই দায় সম্পূর্ণ মামলার চার্জশীট দাখিলকারী কর্মকর্তার।

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ পরিদর্শক মেহেদুল ইসলাম সরদার বলেন, আমরা চার্জশিট দাখিল পর্যন্ত কাজ করি। এরপরে আসামি কোথায় থাকে এটা আমাদের জানা থাকে না। এর আগে সিরাজগঞ্জেও এভাবে চার্জশীট দিয়েছি। কোন সমস্যা হয়নি। ইতিপূর্বে আমি এভাবেই চার্জশীট দিয়েছি। তদন্তে যা পেয়েছি তাই চার্জশিটে দিয়েছি। তব ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের রংপুর জেলার সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু আমার দেশকে বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বরাবরাই মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জনবলের অপ্রতুলতার অজুহাত দেখায়। চার্জশীটে ভুল কলামে নাম দিয়ে পিসিপিআরে আসামি মোরছালিন মিয়াকে অব্যাহতি দেখিয়ে বিদেশ পালানোর সুযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে ওই চার্জশীটে তদন্তকারী কর্মকর্তা ছাড়াও তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যাদের স্বাক্ষর রয়েছে,তারা সবাই অপরাধী।

তিনি আরো বলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ-পরিদর্শক মেহেদুল ইসলাম সরদার ও উপ পরিচালক দিলারা রহমান সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন করেছে। চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ পরিচালক দিলারা রহমান জানান, যে অভিযোগগুলো উঠেছে এগুলো নিয়ে আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলবো। এছাড়া এই মামলার চার্জশীট দেয়া হয়েছে। এই বিষয়ে আদালত অবজারভেশন দিলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তবে আমি কোন অপরাধের সাথে জড়িত। তাই ঘোষ গ্রহণের কোনো প্রশ্নই আসে না বলে তিনি জানান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন