গাইবান্ধার ফুলছড়ি থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবি দিনে দিনে জোরালো হচ্ছে। ইতোমধ্যে ফুলছড়ি, সাঘাটা তথা গাইবান্ধার মানুষ এ দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। দাবি আদায়ে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন তারা। সেতু নির্মাণের দাবিতে জনমত গঠন এবং সভা-সমাবেশ ছাড়াও আন্দোলন কমিটিও গঠন করেছেন এলাকাবাসী। যমুনার বক্ষে এ সেতু নির্মাণ করা হলে গাইবান্ধাসহ আশপাশের আট জেলার মানুষের সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
ইতোমধ্যে ফুলছড়ি উন্নয়ন ফোরামের উদ্যোগে তিস্তামুখ-বাহাদুরাবাদ ঘাট সেতু নির্মাণ বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির ব্যানারে সেতু নির্মাণের দাবিতে প্রতিনিয়ত সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে কথা হলে ফুলছড়ি উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক মাহামুদুন্নবী টিটুল বলেন, পিছিয়ে পড়া বঞ্চিত এলাকাবাসীর জন্য সেতু নির্মাণ খুব জরুরি। এখানে সেতু নির্মাণ করা হলে মানুষের জীবনের গতিপথ পাল্টে যাবে। এ দাবি এখন উত্তরাঞ্চলবাসীর দাবিতে পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, গাইবান্ধার ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র ও যমুনাবেষ্টিত মানুষ দীর্ঘকাল ধরে অসহনীয় কষ্টে বালাসি-বাহাদুরাবাদ ঘাট পাড়ি দিয়ে যাতায়াত করেন। ফুলছড়ি উপজেলার এপারে বালাসি ঘাট থেকে ওপারে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত যাতায়াতের একমাত্র ভরসা নৌযান। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ নদী পারাপার হন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। মানুষের অতিরিক্ত ভিড়, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং নদীর প্রবল স্রোত কখনো কখনো পারাপারকে করে তোলে এক অনিরাপদ যাত্রায়।
এক সময় গাইবান্ধার ফুলছড়ি থেকে ওপারে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত রেলওয়ের ফেরি চলাচল করত। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্নভাবে দুই পারে জমজমাট পরিবেশ ছিল। এই চলাচলকে কেন্দ্র করেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করত খেটে খাওয়া মানুষগুলো। নদীর নাব্য সংকটসহ বিভিন্ন কারণে প্রায় ২৫ বছর ধরে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। তখন থেকেই দীর্ঘ এ পথে নৌকা চলাচল করে। অতি কষ্টে ভোগান্তির শিকার হয়ে দুপারের মানুষ যাতায়াত করে। নদী পারাপারের এ দুর্ভোগ শুধু সাধারণ মানুষের নয়; প্রভাব ফেলছে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতেও। এ এলাকায় উৎপাদিত পণ্য সহজে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এতে কৃষকরা তাদের ন্যায্য দাম থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, পানিশূন্য বালুচরগুলো এখন মরুভূমির মতো ধু-ধু প্রান্তর। কোথাও কোথাও ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে পার হতে হয়। এক সময় যেখানে ঢেউয়ের গর্জনে কেঁপে উঠত, সেখানে এখন শুধু বালু আর বালু। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় ব্রহ্মপুত্র নদ শুকনা থাকায় এ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নৌপথ বন্ধ হওয়ায় কৃষিপণ্য পরিবহনে দেখা দিয়েছে মারাত্মক সংকট। চরাঞ্চলে উৎপাদিত ধান, ভুট্টা, সবজি ও পাট জেলার চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও নদীপথ অচল হয়ে পড়ায় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
দীর্ঘদিনের এ ভোগান্তি নিরসনে বালাসি থেকে বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত একটি সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন গাইবান্ধার মানুষ। এ সেতু নির্মাণ হলে উত্তরবঙ্গের আট জেলার মানুষের যাতায়াতব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। ঢাকাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে। এতে সময়, অর্থ দুটিই বাঁচাবে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
ফুলছড়ি এলাকার বাসিন্দা মজিবর রহমান বলেন, এখানে সেতু নির্মাণ করা হলে শুধু এলাকার উন্নয়ন হবে না, পুরো উত্তরবঙ্গকে রাজধানীর আরো কাছে নিয়ে আসবে। কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলের উৎপাদিত ফসল দ্রুত বাজারজাতকরণে সহায়ক হবে। অর্থনীতিতে বিরাট ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বালাসি এলাকার বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, আমরা বছরের পর বছর ধরে এই নদী পাড়ি দিয়ে আসছি। মানুষ ও দেশের স্বার্থে এ এলাকায় সেতু নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। একটি সেতু আমাদের জীবন ও জীবিকায় নতুন আলো নিয়ে আসবে।
ফুলছড়ির গজারিয়া এলাকার বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক আতিকুর রহমান বলেন, ফুলছড়ি থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত যমুনা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ করা হলে এলাকার মানুষের জীবনের আমূল পরিবর্তন হবে।
ভরতখালী এলাকার ব্যবসায়ী শওকত মির্জা রুস্তম বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার এ এলাকায় টানেল নির্মাণের নামে মানুষকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে গেছে, যা বাস্তবায়নে কোনো ধরনের কাজ করেনি তারা। এ এলাকায় একটি সেতু নির্মাণ হলে মানুষের জীবনের মান বেড়ে যাবে। ব্যবসায় প্রসার ঘটবে। তাই সেতু নির্মাণ এখন এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি।
২০২২ সালে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বালাসি ও বাহাদুরাবাদ ঘাটে ফেরি টার্মিনাল ও আধুনিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা। বিভিন্ন সমস্যার কারণে মাত্র কয়েক দিন পরই ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফেরি টার্মিনালসহ বিশাল স্থাপনাটি এখন কোনো কাজে আসছে না। ঘাটে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজার অলস পড়ে থাকতে দেখা গেলেও নদী খননে কার্যকর কোনো ভূমিকা চোখে পড়েনি।
সাঘাটা-ফুলছড়ি এলাকার সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়ারেছ সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সেতু নির্মাণের দাবি উত্থাপন করে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। তারপর থেকেই আরো জরালো হয়েছে সেতু নির্মাণের দাবি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

