বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা ভারতের অন্তত ৯টি জেলায় সক্রিয় রয়েছে একাধিক মাদকের কারখানা। যেখান থেকে সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে মাদকদ্রব্য। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও বিজিবির ধারাবাহিক অভিযানের পরও লালমনিরহাট সীমান্তের অন্তত ২৬টি রুটকে নিরাপদ পথ হিসেবে ব্যবহার করে দেশে ঢুকছে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ নানা মাদক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক জব্দ অভিযানের পরও এসব চালান সড়ক, রেলপথ ও নৌপথে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে।
মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি স্থায়ী মাদকাসক্ত এবং বাকি ৫০ লাখ সুযোগ বুঝে মাদক সেবন করে। আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে নারী মাদকসেবীর সংখ্যাও। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তরুণ প্রজন্ম; মোট মাদকসেবীর প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। অতি সম্প্রতি মাদক চোরাচালান ও পরিবহনের কাজে নারী ও শিশুদের ব্যবহার করার মতো ভয়ংকর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
লালমনিরহাটে পাড়া-মহল্লায় হাত বাড়ালেই মিলছে সব ধরনের মাদক। ফেনসিডিল ও ইয়াবায় ডুবে থাকছে উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত শ্রেণির হাজারো মানুষ। তালিকায় রয়েছে উঠতি বয়সের যুবক, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে যে চক্রটি মাদক চোরাচালানে সক্রিয় ছিল, সেই একই চক্র সুযোগ বুঝে আবার বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
সীমান্তবাসী সূত্রে জানা গেছে, জেলার প্রায় ২৪৮ কিলোমিটারজুড়ে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে। এ সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে রয়েছে বিজিবির তিনটি ব্যাটালিয়ন (১৫ বিজিবি, রংপুর ৫১ বিজিবি এবং রংপুর ৬১ বিজিবি তিস্তা-২)। এসব ব্যাটালিয়নের অধীনে থাকা অর্ধশতাধিক পয়েন্ট দিয়ে আসছে ফেনসিডিল, গাজা, মদ ও ইয়াবা। বিশেষ করে পাটগ্রামের জোংড়া, জগতবেড়, নাজির গোমানি, বুড়িমারী, সানিয়াজান; হাতীবান্ধার ভুটিমঙ্গল, বড়খাতা, গোতমারী, দইখাওয়া, জাওরানী, বনচৌকি, ভেলাগুড়ি, পূর্বকদমা; কালীগঞ্জের শিয়ালখাওয়া, গোড়ল, চন্দ্রপুর, চামটা, চাপারহাট; আদিতমারীর দুর্গাপুর, ভেলাবাড়ী, মোগলহাট, চওড়াট্যারী এবং সদরের কুলাঘাট, শীবেরকুটি ও শালমারীর চরসহ বিভিন্ন স্পটকে মাদক পাচারের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাচালানি সিন্ডিকেট।
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা মশিউর রহমান ও মফিজুল ইসলাম বলেন, সীমান্তে রাতে নো-ম্যান্সল্যান্ড চোরাকারবারিদের দখলে চলে যায়। মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস কিংবা থ্রি-হুইলারে করে বিভিন্ন স্থান থেকে তরুণ-যুবকেরা মাদক সেবন করতে সীমান্ত গ্রামে ছুটে আসে। মাদক সহজলভ্য হওয়ায় এলাকার চুরি-ছিনতাই বেড়ে গেছে। প্রায়ই ছোট ছোট চালান ধরা পড়লেও নেপথ্যের মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট ব্যাটালিয়নের (১৫ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম (পিএসসি) বলেন, দেশের যুবসমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে বিজিবি সর্বদা সতর্ক রয়েছে। স্পর্শকাতর সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং এই কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে।
মাদক ও অনলাইন জুয়ার প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক আরিফুল ইসলাম (৩৫)। ২১ আগস্ট রাতে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। আরিফুল আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে।
জানা গেছে, সমাজ থেকে সামাজিক অপরাধ দমনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর উদ্যোগে ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ নামে একটি সামাজিক সচেতনতামূলক আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। এই কমিটির আহ্বানে শিক্ষক আরিফুল ইসলাম নিজ গ্রাম গন্ধমরুয়ায় পরিচালিত অনলাইন জুয়া ও মাদকের কারবার বন্ধে স্থানীয় চক্রটিকে সতর্ক করেন এবং অপরাধ ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। চক্রটি ভালো না হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর ঘোষণা দেন তিনি।
সামাজিক অপরাধ দমনের এই ঘোষণাই কাল হয় শিক্ষক আরিফুলের জন্য। গত ১ আগস্ট কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে আগে থেকে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসী রহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি চক্র দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে শিক্ষকের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা তার মাথায় কোপ দিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। উদ্ধার করে প্রথমে লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে রংপুর মেডিকেল ও ঢাকায় নেওয়া হলেও টানা ২১ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মারা যান এই শিক্ষক।
ঘটনার বিষয়ে আদিতমারী থানার ওসি নাজমুস সাকিব সজীব জানান, শিক্ষক হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার ১০ জন আসামির মধ্যে ৮ জন জামিনে রয়েছে। ১ জন কারাগারে এবং পলাতক আরেকজনকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

