গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনে জয়-পরাজয়ের প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে চরাঞ্চলের ভোট। দুই উপজেলার আটটি চর এলাকার মানুষের নদীভাঙন রোধ এবং অবকাঠামোসহ জীবনমানের উন্নয়নের বিষয়টিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সংসদ নির্বাচনে এ এলাকার ভোটের রাজনীতি আবর্তিত হয় মূলত এ দুই ইস্যুকে কেন্দ্র করেই। তাই নদীভাঙন স্থায়ীভাবে রোধে স্থায়ী করণীয় নির্ধারণ, চর এলাকার জীবনমানের উন্নয়ন ও পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি সমাধানে প্রতিশ্রুতি দিলে তার প্রতিই ঝুঁকে পড়বেন সাধারণ ভোটার।
গাইবান্ধা-০৫ (সাঘাটা–ফুলছড়ি) আসনটি ব্রহ্মপুত্র ও যমুনাবিধৌত এলাকা। দুই উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিবারই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় নদী ভাঙন ও চরের উন্নয়ন। প্রতি বছর নদীভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাটবাজার হারিয়ে নিঃস্ব হন মানুষ।
চরের ভোটাররা জানান, এবারও তারা এমন প্রার্থী চান, যিনি নির্বাচিত হয়ে এসব সমস্যার স্থায়ী ও কার্যকর সমাধানে কাজ করবেন।
সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসন। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর দুই পারের লাখো মানুষ বছরের পর বছর ধরে ভাঙা-গড়ার লড়াইয়ের শিকার। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি। সামর্থ্যবানরা বসতভিটা সরিয়ে নিতে বিভিন্ন এলাকায় বসত গড়তে পারলেও নিঃস্ব মানুষ অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে কোনো মতে বসবাস করে থাকেন। তাদের সারা বছরই দিন কাটে বাস্তুভিটা সমস্যায়।
ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ বালুচরে বর্তমানে একধরনের কৃষি বিপ্লব ঘটেছে। ছোট-বড় অন্তত অর্ধশতাধিক চরে বছরে প্রায় ২ লাখ টনের বেশি বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হয়। কিন্তু এই বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চরাঞ্চলে নেই উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা।
চরাঞ্চলের হলদিয়া এলাকার বাসিন্দা কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে আমরা কৃষি পণ্য সময়মতো বাজারে নিয়ে যেতে পারি না। এলাকার আশপাশেও নেই কোনো হিমাগার।’
একই কথা জানিয়ে কৃষক শাজাহান আলী বলেন, ‘আমাদের উৎপাদিত ফসল বিক্রির জন্য ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক কষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে হয় ।ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না।’
কোনো চরেই হাসপাতাল নেই। অসুস্থ রোগী নিয়ে প্রতিদিনই বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় চর এলাকার লোকজনকে। বিশেষ করে প্রসূতি মায়ের জন্য সবচেয়ে কষ্টকর পরিস্থিতি দাঁড়ায় প্রতিনিয়তই। এখানে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও মানসম্পন্ন হাসপাতালের অভাবে প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর ঘটে মাঝে মধ্যেই।
নেই ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভাঙনের কবলে পড়ে বছরে কয়েকবার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরিয়ে নিতে হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নাজুক। অধিকাংশ চরে নেই কোনো পুলিশ ফাঁড়ি।
ব্রহ্মপুত্র নদের কিছু কিছু জায়গায় লোক দেখানো বাঁধের প্রতিরক্ষা কাজ শুরু হলেও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বাকি অংশগুলোতে প্রতি বছরই দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ ভাঙন। স্থানীয়দের অভিযোগ, টেকসই বাঁধ ও নদীশাসন পরিকল্পনার অভাবেই এই দুর্ভোগ বছরের পর বছর চলছেই।
ফুলছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন ও মকসেদ আলী বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যের আশ্রয়ে বসবাস করছি। আমাদের স্থায়ী নিবাস গড়ে ওঠেনি কোথাও। আসন্ন নির্বাচনে আমাদের চরের উন্নয়নে যে প্রার্থী কাজ করবে, তাকেই আমরা ভোট দিব।’
এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়নের আগলার চরের বাসিন্দা সাইদুর রহমান ও ফজলুপুর ইউনিয়নের লালুমিয়ার চরের আসরাফ আলি বলেন, ‘চরের কষ্ট নিরসনে যে প্রার্থী শক্তভাবে প্রতিশ্রুতি দেবে, তার প্রতি ঝুঁকে পড়বে সবাই।’
‘আমাদের কোনো দল-পার্টি নেই। চরকে নিয়ে যে প্রার্থী ভাববে, আমরা তাকেই সমর্থন দেব’ জানালেন হলদিয়ার চরের বাসিন্দা কৃষক মোজাম্মেল হক।
তাদের মতে, ‘নির্বাচন আসলেই আমাদের নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়। ভোট আদায়ের চেষ্টা করেন সবাই। কিন্তু তাদের স্থায়ী সমস্যা সমাধানের চিন্তা করেন না কেউ।’
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফারুক আলম সরকার বলেন, ‘বিগত দীর্ঘদিন থেকেই চর এলাকার দ্বারে দ্বারে ঘুরে তাদের সমস্যার কথা শুনেছি। এবার নির্বাচিত হতে পারলে অবশ্যই তাদের বিষয়টি প্রাধান্য দেওয়া হবে। নদীর তীর সংরক্ষণের মাধ্যমে নদীকে মানুষের অভিশাপ নয়, আশীর্বাদে পরিণত করতে স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার ইচ্ছা আছে।’
জামায়াত মনোনীত প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হলে নদীভাঙন রোধের পাশাপাশি চরাঞ্চলে পশুপালন কেন্দ্র, পুলিশ ফাঁড়ি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করব। গড়ে তুলবেন মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া বালাসী থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত টানেল বা সেতু নির্মাণ, ট্যানারি ও জুট মিল স্থাপনের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করার পরিকল্পনা আছে।’
এছাড়া অন্যান্য প্রার্থীরাও চরাঞ্চল চষে বেড়াচ্ছেন। দিচ্ছেন প্রতিশ্রুতির নতুন নতুন ফুলঝুরি।
সব মিলিয়ে নদীভাঙন রোধ, চরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন ও নিরাপদ জীবনযাত্রাই এ আসনের ভোটারদের কাছে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন অনেকে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

