মৌলভীবাজারে লংলা চা বাগানে কাজ করছেন হনুমান টিলার মালতি ভর। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেবতাকে পুজো দিয়ে পরিবারের জন্য রান্নাবান্না করে রওয়ানা দেন কাজে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা বা তারও পর পর্যন্ত বাগানে পাতা তোলে বাড়িতে এসে আবারো শুরু করেন ঘরের কাজ। যা মজুরি পান তাতে সংসার চলে না। ঘরবাড়ির অবস্থাও ভালো নেই।
একই অবস্থা মাদ্রাজী টিলার শুভদ্রা নাইডুর। থাকেন মামার বাড়িতে। বাগানের নিয়মিত শ্রমিক হয়েও নেই থাকার ঘর। কষ্ঠ করে নিজেই একটি ঘর করে থাকেন মা ও বোনের ছেলেকে নিয়ে। সকাল শুরু হয় আটা রুটি ও লাল চা দিয়ে। তারপর সারাদিনের পরিশ্রম। শুভদ্রা বলেন, বাগানে মহিলা শ্রমিক কাজ না করলে বাগানই থমকে দাঁড়াবে।
এরকম অবস্থা সকল নারী চা শ্রমিকদের। নারী শ্রমিকরা বলেন, তাদের বাইরেও জ্বালা ঘরেও জ্বালা। রয়েছে ঘর, ভূমি, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনসহ নানা সমস্যা। সর্বত্রই তারা নির্যাতীত। সারা জীবন কাজের মধ্যেই ডুবে থাকেন। বাড়ি ঘরের অবস্থা তো খুবই করুন। সেকশনে বৃষ্টিতে ভিজে এসে বাড়িতে টিনের চালে ছিদ্র থাকায় সেখানেও ভিজতে হচ্ছে।
লংলা চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি গৌরাঙ্গ কুমার বাক্তি জানান, বাগানে নিয়মিত মহিলা শ্রমিকদের ছুপি (ছাতা) ও গামছা দেয়া হয় না। সেকশনে নেই টয়লেটের ব্যবস্থা। ঝড় আসলে নেই আশ্রয় নেয়ার কোনো স্থান। মহিলা শ্রমিকরা খুবই কষ্ঠে কাজ করেন।
পার্বতী রবিদাস, লংলা চা বাগানের মহিলা দফার সর্দারনী জানান, নারীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজে যেতে হয়। সরকারিভাবে সবাই ৬ মাস বা ১৮০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি পেলেও চা শ্রমিকরা তা থেকে বঞ্চিত। এমনকি সন্তান প্রসবের আগের দিন পর্যন্ত কাজ করলেও মিলছে না ন্যায্য মজুরি। ঠিকমত চিকিৎসা সেবাও পান না তারা, নিজের টাকায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
চা শ্রমিক নারী নেত্রী মনি গোয়ালা জানান, সবগুলো বাগানেই ৭০ ভাগ নারী শ্রমিক কাজ করেন, তাদের হাত বন্ধ হলে বাগানগুলেঅ বন্ধ হয়ে পড়বে। নারীরা চা বাগানের প্রাণ হলেও সবক্ষেত্রেই নারীরা অবহেলিত। না পাচ্ছেন সঠিক চিকিৎসা, না পাচ্ছেন সঠিক মজুরি ও গর্ভকালীন ছুটি। সর্বত্রই নারীরা অবহেলিত। মে দিবসে নানা আশার বাণী শোনলেও কাজের কাজ কিছুই হয় না।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, চা শ্রমিকদের সংগঠন প্রতিবছর মে দিবসে শ্রমিক সমাবেশে তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরে আসছেন। অভিযোগ করে বলেন, মালিক-শ্রমিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হলেও অনেক বাগান সম কাজ সম মজুরি দিচ্ছে না।
এ বিষয়ে চা সংসদের সিলেট অঞ্চলের সভাপতি জি এম শিবলী বলেন, বাগানগুলো চেষ্ঠা করছে শ্রমিকদের চাহিদামতো সুযোগ সুবিধা দিতে, অনেক বাগান দিয়েও যাচ্ছে। ইতিমধ্যে সরকারও চা বাগান শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে এগিয়ে এসেছে এবং বৃহৎ একটি পরিকল্পনাও নিয়েছে সেগুলো বাস্তবায়িত হলে চা শ্রমিকদের স্যানিটেশন ও সুপেয় পানির অভাব অনেকটাই লাঘব হবে।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

