চার বছর বয়সে রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কাঁদতে কাঁদতে ঘুরছিল অভিভাবকহীন ছোট্ট কন্যাশিশু। চারপাশে শত মানুষের ভিড়, ট্রেনের হুইশেল, ব্যস্ততার শব্দ; কিন্তু তার পাশে দাঁড়ানোর ছিল না কেউ। নাম জিজ্ঞেস করলে শুধু অস্পষ্ট কণ্ঠে বলেছিল, ‘স্বপ্ন ‘। সেই নামই হয়ে ওঠে তার পরিচয়, স্বপ্না আক্তার।
২০১২ সালের একদিন সিলেট রেলওয়ে স্টেশন থেকে উদ্ধার করা হয় তাকে। তখন বয়স মাত্র চার। কোথা থেকে এসেছে, কে তার বাবা-মা! এ প্রশ্নের উত্তর জানত না কেউ। শিশুটির চোখে ছিল ভয় আর অনিশ্চয়তা। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তার বাবা-মা আর বেঁচে নেই। ফলে হারিয়ে যাওয়া সেই শিশুর আর কোনো ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এরপর তাকে আশ্রয় দেয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র। সেখানেই শুরু হয় তার নতুন জীবন। আশ্রয়, খাবার আর নিরাপত্তার পাশাপাশি তাকে ভর্তি করানো হয় স্কুলে। ধীরে ধীরে বই-খাতা, বন্ধু আর স্বপ্নে ভরে ওঠে তার জীবন। একসময় যে মেয়ে নিজের নামও স্পষ্ট করে বলতে পারত না, সেই স্বপ্নাই ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।
দীর্ঘ ১৪ বছর পর বুধবার দুপুরে সেই পুনর্বাসন কেন্দ্রেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন স্বপ্না। সিলেট নগরীর শিবগঞ্জ লামাপাড়ার কেন্দ্রটি যেন এক দিনের জন্য রূপ নেয় ভালোবাসার ঘরে। যে প্রতিষ্ঠান একসময় তাকে আশ্রয় দিয়েছিল, আজ তারাই হলো অভিভাবক।
বিয়ের পুরো আয়োজন ছিল আবেগে ভরা এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। কোথাও কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। ছিল না ‘এতিম’ বা ‘অসহায়’ শব্দের কোনো ছাপ। বরং মনে হচ্ছিল, পরিবারের আদরের মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। সাজসজ্জা, অতিথি আপ্যায়ন, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, সবকিছুই ছিল পরিপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। কারণ, পরিবারহীন এক মেয়েকে ঘিরে সমাজের এত মানুষের ভালোবাসা খুব কমই দেখা যায়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এস এম মোক্তার হোসেন জানান, স্বপ্নার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় এবং তার সম্মতিতেই বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। তারা চেয়েছেন মেয়েটির ভবিষ্যৎ যেন নিরাপদ ও সুন্দর হয়।
পাত্রও সিলেটের বাসিন্দা। তিনি ইলেকট্রিকের ঠিকাদারি কাজ করেন। বিয়েকে ঘিরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এগিয়ে আসেন সহায়তার হাত নিয়ে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রায় ২ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেন, যা স্বপ্নার নামে এফডিআর করা হবে। স্থানীয় এক ব্যক্তি উপহার দেন প্রয়োজনীয় আসবাব। এমনকি একটি মিষ্টি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান উপহার হিসেবে দেয় ১০০ কাপ দই।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুচিত্রা রায়, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আব্দুর রফিকসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা।
আবেগাপ্লুত হয়ে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র শুধু একটি শিশুকে আশ্রয় দেয়নি, তাকে শিক্ষিত করে নতুন জীবনের পথও তৈরি করেছে। আজ তার বিয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ভিত্তিও গড়ে দিল।’
স্বপ্নার গল্প শুধু একটি বিয়ের গল্প নয়, এটি মানবিকতার গল্প, সমাজের দায়িত্ববোধের গল্প এবং প্রমাণ। একটি শিশুকে ভালোবাসা দিলে সেও একদিন নিজের জীবন নতুন করে গড়তে পারে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

