সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ত্রিপুরাপল্লীর টিলায় ধস

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ত্রিপুরাপল্লীর টিলায় ধস
ছবি: আমার দেশ

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের টিলার ওপর গড়ে ওঠা ত্রিপুরা পল্লীর ২৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। টানা বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ছড়ার প্রবল স্রোত ও মাটি ধসের কারণে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে তাদের বসবাসের টিলা। বছরের পর বছর ধরে চলা এই ভাঙনে ইতোমধ্যে টিলার বড় একটি অংশ ধসে পড়েছে। ঝুঁকির মুখে রয়েছে পল্লীবাসীর ঘরবাড়ি, চলাচলের রাস্তা এবং পুরো বসতি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ভেতরে অবস্থিত ত্রিপুরা পল্লীর চারপাশের মাটি ধসে বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। পল্লী থেকে বের হওয়ার একমাত্র ব্রিজটির এক পাশের মাটি সরে গিয়ে সেটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে স্থানীয়দের বিকল্প দুর্গম পথ ব্যবহার করে চলাচল করতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

পল্লীবাসী জানান, বর্ষা মৌসুমে এলেই তাদের আতঙ্ক বেড়ে যায়। টানা বৃষ্টিপাত শুরু হলেই টিলার বিভিন্ন অংশ ধসে পড়ে। পাহাড়ি ছড়ায় পানি বাড়লে বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অসুস্থ ও বয়স্ক মানুষদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যাওয়াও অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ত্রিপুরা পল্লীর হেডম্যান চিত্তরঞ্জন দেববর্মা বলেন, এই পাহাড়ে আমাদের জন্ম, আমাদের জীবন-জীবিকা সবকিছু। জায়গাটি আমাদের কাছে শুধু বসবাসের স্থান নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ। আমরা কখনো টিলা কাটিনি, বরং রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে টিলা ধসে এখন আমাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘ছোটবেলায় যেসব ছড়া ছোট দেখেছি, এখন সেগুলো বড় হয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। প্রতি বর্ষায় টিলা ধসে নতুন নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সামনের দিনগুলো নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।’

সন্ধ্যা রাণী দেববর্মা জানান, ২০১৭ সালে প্রথম বড় ধরনের টিলা ধস শুরু হয়। তখন তিনটি পরিবার নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তী সময়ে আরো দুটি পরিবার স্থানান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে পুরো টিলাটিই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরো পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়বে। এই টিলাগুলো শুধু মানুষের বসবাসের জায়গা নয়, জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। টিলা ধসে গেলে পরিবেশেরও বড় ক্ষতি হবে।’

বাসিন্দা শাহিন দেববর্মা বলেন, ‘প্রতিবার বৃষ্টি হলেই টিলা ধসে পড়ে। এভাবে ধসে প্রায় অর্ধেক টিলা বিলীন হয়ে গেছে। যাতায়াতের একমাত্র ব্রিজটিও এখন ঝুঁকিতে। দ্রুত স্থায়ী প্রকল্প নেওয়া না হলে পুরো পল্লী হারিয়ে যেতে পারে।’

সাতছড়ি তেলমাছড়া বিট অফিসার মেহেদি হাসান বলেন, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে ত্রিপুরা পল্লীসহ আশপাশের টিলাগুলো ধসে পড়ছে। গাছপালাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পল্লীর একমাত্র ব্রিজটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গালিব চৌধুরী বলেন, ত্রিপুরা পল্লীর ভাঙন রোধে বড় ধরনের অর্থের প্রয়োজন। স্থানীয় বাসিন্দারা লিখিত আবেদন দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর বিকল্প আবাসনের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন