পাহাড়, সমুদ্র, ঝরনা ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। এ উপজেলায় রয়েছে চন্দ্রনাথ পাহাড়, গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত, খৈয়াছড়াসহ পাহাড়ি ঝরনা, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকো পার্ক। বছরজুড়ে এসব পর্যটনকেন্দ্রে বাড়ছে পর্যটকদের আনাগোনা।
স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়ছে ইতিবাচক। গড়ে উঠছে নতুন ব্যবসা, সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান। তবে যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যটন অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সেবার মানোন্নয়নের ঘাটতি এসব সম্ভাবনাকে কাঙ্ক্ষিত উচ্চতায় পৌঁছাতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সীতাকুণ্ডের প্রধান আকর্ষণ চন্দ্রনাথ পাহাড়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ ফুট উচ্চতায় এ পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে চন্দ্রনাথ মন্দির। প্রতিবছর শিবচতুর্দশী উপলক্ষে দেশ-বিদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে এখানে। ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি পাহাড়চূড়া থেকে বঙ্গোপসাগর, সন্দ্বীপ চ্যানেল ও চারপাশের বিস্তীর্ণ সবুজ প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ।
এরসাথে নতুন মাত্রা যোগ করেছে গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত। কেওড়াবনে ঘেরা এই সৈকতে সবুজ চর, জোয়ার-ভাটার বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ একে দেশের অন্যান্য সমুদ্রসৈকত থেকে আলাদা করেছে। একই সঙ্গে বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত, ভাটিয়ারী গলফ অ্যান্ড কান্ট্রি ক্লাব এবং সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকো পার্কও পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

বর্ষা মৌসুমে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া, রূপসী, কমলদহ, সহস্রধারা ও সুপ্তধারা ঝরনা। সেখানে প্রতিদিনই ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা। বিশেষ করে খৈয়াছড়া ঝরনার বহুধাপবিশিষ্ট জলধারা, দুর্গম ট্রেইল, পাথুরে ঝিরিপথ ও ঘন অরণ্যের পরিবেশ তরুণদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
পর্যটন সম্প্রসারণের ফলে সীতাকুণ্ডের অর্থনীতিতেও দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, স্থানীয় খাদ্য ব্যবসা, পর্যটনসামগ্রী বিক্রি ও ট্যুর গাইড সেবাকে ঘিরে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় অনেক তরুণ প্রশিক্ষণ নিয়ে পর্যটন গাইড হিসেবে কাজ করছেন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও পর্যটকদের চাহিদাকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবসা শুরু করেছেন।
পর্যটকদের নিরাপত্তা ও তথ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যটন ট্রেইলের প্রবেশমুখে কিউআর কোডসম্বলিত ডিজিটাল তথ্যবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বিত নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় পর্যাপ্ত মানসম্মত আবাসন, আধুনিক পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, পরিকল্পিত পার্কিং, নিরাপদ ট্রেইল, উন্নত স্যানিটেশন ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে যোগাযোগব্যবস্থা।

সীতাকুণ্ড রেলস্টেশনে অধিকাংশ আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি না থাকায় ঢাকা, কুমিল্লা, ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত পর্যটকদের সড়কপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, রেল যোগাযোগ আরো সহজ করা গেলে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত উন্নয়নের পাশাপাশি পাহাড়, ঝরনা ও উপকূলীয় পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য, পাহাড়ি পরিবেশের ক্ষয় এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের ঝুঁকি এখন থেকেই কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়তে পারে।

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের অভিমত, সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, মানসম্মত পর্যটনসেবা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে সীতাকুণ্ড শুধু চট্টগ্রাম বা বাংলাদেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে। পাহাড়, সমুদ্র, ঝরনা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এই অনন্য জনপদ এখন পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও নান্দনিক সৌন্দর্যের কারণে সীতাকুণ্ড দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকদের সুবিধার্থে ওয়াশরুম নির্মাণ, সড়ক ও সেতু সংস্কার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সহযোগিতা ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সীতাকুণ্ডের পর্যটন শিল্প আরো বিকশিত হবে এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

