নবীগঞ্জের রায়হান চৌধুরী (৩০) নামের এক যুবককে ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে লিবিয়ায় আটক রেখে ২৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের পরও ছেড়ে দেওয়া হয়নি। আরো ২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার জন্য মারপিট করে ভিডিওকলে হাতের আঙুল কেটে দেওয়ার দৃশ্য দেখিয়ে হাতের কবজি কাটার হুমকি দিচ্ছে দালাল চক্র। নির্যাতন করার পর গত ৪২ দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছে রায়হান চৌধুরী। এমন অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যরা। ওই দালাল চক্রের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা করে বিপাকে পড়েছেন ভুক্তভোগীর পরিবার। গত রোববার মামলার প্রধান আসামি গোপনে জামিন নেওয়ার চেষ্টা করলে আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠিয়েছে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার বেতাপুর গ্রামের আবু তাহের চৌধুরী গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নবীগঞ্জ থানায় মানব পাচার আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, তার ছেলে রায়হান চৌধুরী সহপাঠী শামীম এখন ইতালি থাকে।
মোবাইলে ইতালি থেকে দালাল ও মানব পাচার চক্রের সদস্য শামীম ও তার সহযোগী রাকিব ইতালিতে ফ্রি ভিসায় নেওয়ার কথা বলে তার ছেলেকে উদ্বুদ্ধ করেন। তাদের প্রলোভনে ইতালি যাওয়ার জন্য রাজি হয়ে বাদী তাদেরকে পাসপোর্ট দেন।
কয়েকদিন পর মানবপাচার চক্রের সদস্য শামীমের বাবা নজরুল ইসলাম, তার স্ত্রী হাসেনা বেগম, মেয়ে রিনু বেগম, শান্তা বেগম, রুবিনা বেগম তার বাড়িতে এসে বাদীকে জানায় যে, তার ভিসা হয়েছে। তাদের কথামতো গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর রায়হানের বাবা তাদেরকে ১০ লাখ টাকা দেন।
এর কিছুদিন পর রায়হান চৌধুরীর পাসপোর্ট দেওয়ার সময় দালাল রাকিব বাড়িতে গিয়ে আরো নগদ দুই লাখ টাকা নেয়। টাকা পাওয়ার পর মানব পাচার চক্রের সদস্যরা ভিকটিম রায়হান চৌধুরীকে প্রথমে ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব ও পরে মিসর হয়ে লিবিয়া নিয়ে যায়। সেখানে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য শামীম ও রাকিব মিলে রায়হান চৌধুরীকে ইতালি না পাঠিয়ে জিম্মি করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। তারা রায়হান চৌধুরীর মা, বাবাসহ আত্মীয়স্বজনকে ফোন করে জানায় যে, বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাইলে কিংবা ইতালি যেতে চাইলে দেশে থাকা তাদের সদস্য নজরুল ইসলামের কাছে আরো ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। রায়হান চৌধুরীকে মারপিট করে ভিডিওকলে পরিবারের সদস্যদের দেখানো হয়। তার একটি আঙুল কেটে দেওয়া হয়েছে। তাদের কথামতো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে হাতের কবজি কেটে দেওয়ারও হুমকি দেয় মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। তাই বাধ্য হয়ে ভিকটিমের বাবা জমি ও সোনা বিক্রি করে ১৫ লাখ টাকা দেশে থাকা পাচারকারী চক্রের সদস্যদের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ও বিকাশের মাধ্যমে প্রদান করেন।
তারা মোট ২৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা পাওয়ার পরও ভিকটিম রায়হান চৌধুরীকে দেশে বা ইতালি পাঠায়নি। এখন আবারও রায়হানকে মারপিটের ভিডিও দেখিয়ে আরো ২৫ লাখ টাকা দাবি করলে তার বাবা নিরুপায় হয়ে নবীগঞ্জ থানায় মানব পাচার আইনে মামলা করেন। মামলা দায়েরের পর থেকে রায়হান চৌধুরী নিখোঁজ রয়েছেন। দালাল চক্র তাকে কোথায় রেখেছে তার কোনো খরব তারা পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে মামলার বাদী আবু তাহের চৌধুরী বলেন, আমি মামলা করে বিপাকে পড়েছি। আমি এখন আমার ছেলের কোনো সন্ধান পাচ্ছি না। সে কোথায়, কীভাবে আছে আল্লাহ ভালো জানেন। আমার ছেলে রায়হান চৌধুরীকে মারপিট করে ভিডিওকলে দেখায়। তার একটি আঙুল কেটে দিয়ে বলে তাদের দাবি করা টাকা না দিলে হাতের কবজি কেটে দিবে। এখন ৪২ দিন ধরে সে নিখোঁজ রয়েছে। আমাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ও জেলহাজতে থাকা প্রধান আসামি নজুরুল ইসলামকে জামিনে নিয়ে আসার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে।
এ বিষয়ে নবীগঞ্জ থানার ওসি মোনায়েম মিয়া বলেন, মামলাটি কিছুদিন আগে অধিকতর তদন্তের জন্য হবিগঞ্জ সিআইডির কাছে প্রেরণ করেছি। এখন বিষয়টি সিআইডি তদন্ত করবেন।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

