সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল বোরো ধানের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সাধারণত দেখা যায় একজাতের ধানের চাষ। তবে এবার সেই চিরচেনা দৃশ্যের ব্যতিক্রম ঘটেছে। একই জমিতে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে ৫১টি ভিন্ন জাতের ধান—যেন ধানের বৈচিত্র্যের এক জীবন্ত প্রদর্শনী।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)’র সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উদ্যোগে শান্তিগঞ্জ উপজেলার সাংহাই হাওরপাড়ের উজানীগাঁও গ্রামে প্রায় ৮ শতক জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে এই ব্যতিক্রমী ‘রাইস মিউজিয়াম’।
একই জমিতে ৫১ জাতের ধান চাষের খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রতিদিন সেখানে ভিড় করছেন আশপাশের এলাকার কৃষকরা। ধানের গাছ, শীষ ও উচ্চতার পার্থক্য সরাসরি দেখে তারা নিচ্ছেন বাস্তব ধারণা। কৃষকদের সুবিধার্থে প্রতিটি ধানের জাতের পাশে নাম লেখা স্টিকারও বসানো হয়েছে। এখানে ব্রি-ধান–১০৪, ব্রি-ধান–১০২, ব্রি-ধান–১০৮, ব্রি-ধান–৮৮সহ বিভিন্ন উচ্চ-ফলনশীল ধানের জাত প্রদর্শন করা হয়েছে।
উজানীগাঁও গ্রামের কৃষক মো. আব্দুল করিম বলেন, এক জায়গায় এত জাতের ধান আমরা আগে কখনো দেখি নাই। গাছের উচ্চতা, শীষ আর ধানের ধরন একেকটা একেক রকম। এতে করে কোন জাত আমাদের জমির জন্য ভালো হবে সেটা বুঝতে সুবিধা হচ্ছে।
আরেক কৃষক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন ধানের জাত একসাথে দেখে অনেক কিছু শেখা যাচ্ছে। আগে শুধু এক-দুইটা জাতের ধানই চাষ করতাম। এখন মনে হচ্ছে নতুন ভালো ফলনশীল জাত বেছে নিয়ে চাষ করলে লাভও বেশি হতে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে ১৩৭টি হাওর। এসব হাওরে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়। প্রতি বছর এখান থেকে উৎপাদন হয় প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
তবে এত বড় উৎপাদনের পরও অনেক কৃষক নতুন ও উন্নত জাতের ধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা পান না। কৃষকদের মাঠ-পর্যায়ে সরাসরি ধারণা দিতে এবং নতুন উদ্ভাবনী জাত সম্পর্কে আগ্রহ বাড়াতেই এই ব্যতিক্রমী ‘রাইস মিউজিয়াম’ তৈরি করা হয়েছে।
ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান ড. মো. রেজওয়ান ভূঁইয়া বলেন, মাঠেই বিভিন্ন জাতের ধান দেখে কৃষকরা সহজেই পার্থক্য বুঝতে পারছেন। এতে তারা নিজের জমির জন্য উপযোগী জাত নির্বাচনেও আগ্রহী হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে কৃষকের মাঠে পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ হাওরাঞ্চলের বোরো চাষে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। ধানের বৈচিত্র্যকে সামনে এনে কৃষকদের সচেতনতা বাড়াতেও এই ‘রাইস মিউজিয়াম’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

