আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

নাব্য হারাচ্ছে সোমেশ্বরী, হুমকিতে শতবর্ষী মধ্যনগর বাজার

মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

নাব্য হারাচ্ছে সোমেশ্বরী, হুমকিতে শতবর্ষী মধ্যনগর বাজার
এক সময়ের খরস্রোতা সোমেশ্বরী নদী এখন মৃতপ্রায়। আমার দেশ

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সোমেশ্বরী নদী ক্রমেই নাব্য হারিয়ে চরে পরিণত হচ্ছে। প্রায় দেড়শ বছর আগে এ নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে মধ্যনগর বাজার। একসময় দেশের অন্যতম প্রধান ধানের আড়ত হিসেবে পরিচিত এ বাজার এখন নদী সংকটে অস্তিত্বের লড়াইয়ে কোনো রকমভাবে টিকে আছে।

মৌসুমভিত্তিক নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। এ বাজারে ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ার প্রধান মাধ্যম হলো নদীপথ। এ বাজারের সঙ্গে প্রধান বাণিজ্যিক সম্পর্কিত শহর মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, ভৈরব, আশুগঞ্জ, জেলা শহর সুনামগঞ্জ এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা থেকেও মালামাল পরিবহনের একমাত্র ভরসা এ নদী। কিন্তু হেমন্তের শুরুতেই নদীর পানি কমে গিয়ে তলদেশ ভেসে উঠে, সৃষ্টি হয় বিস্তীর্ণ চর। ফলে মালামাল পরিবহনে বাড়ছে দুর্ভোগ।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে একাধিক স্থানে পণ্য নামিয়ে নৌকা বদল করে পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে সময় ও খরচ দুটিই বেড়ে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাজারের সার্বিক বাণিজ্যে। নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় কৃষিজমিতে সেচ দিতে গভীর নলকূপ বা সাবমার্সিবল পাম্পই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি আগাম বন্যার আশঙ্কায় কৃষকদের উদ্বেগও বেড়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নৌকার মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পৌষের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন অংশে পানি কমে যায়। কোথাও কোথাও নদীর তলদেশ পুরোপুরি জেগে উঠে। বড় নৌকার চলাচল প্রায় তিন থেকে চার মাস বন্ধ থাকে। পানি কমে এমন অবস্থা হয় কিছু স্থানে জেগে ওঠা চরে স্থানীয়রা ধান রোপণ করেন।

মধ্যনগর বাজার আড়ত কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক বরুণ রায় বলেন, আগে মৌসুমজুড়ে এক হাজার মণের বেশি ধান এক নৌকাতেই আনা-নেওয়া করা যেত। এখন ছোট নৌকায় ভাগ করে আনতে হয়। মাঝপথে নৌকা বদলাতে হয়। এতে সময় বেশি লাগে, খরচও অনেক বেড়ে যায়।

মধ্যনগর বাজারের মুদি ব্যবসায়ী শম্ভু রায় বলেন, আগের তুলনায় মালামাল পরিবহনে খরচ প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। ক্যারিং খরচ বাড়ায় পণ্যের দামেও প্রভাব পড়ছে।

মৎস্য ব্যবসায়ী মুখলেছ মিয়া বলেন, নদীটা বাঁচলে বাজার বাঁচবে। এখন যেভাবে চরে পরিণত হচ্ছে, তাতে কয়েক বছর পর হয়তো নৌ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

মধ্যনগর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আবুল বাশার বলেন, নদীটির নাব্য হারানোর ফলে কৃষির পাশাপাশি মাধ্যনগর বাজারেও মারাত্মকভাবে প্রভাব পড়ছে। কৃষিপণ্যসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও আড়তদার সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে নদী খননের দাবি জানিয়ে আসছি। দ্রুত খননকাজ শুরু না হলে মধ্যনগর বাজার তার ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারাবে।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, আমাদের এ নদীটি খনন করা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। আমি প্রায় দেড় দশক ধরে এ সোমেশ্বরী ও গুমাই নদী খনন করে কংস নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য বিভিন্নভাবে দাবি জানিয়ে আসছি। এ নদীগুলো খনন করা গেলে এ হাওর এলাকার কৃষি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, সেচব্যবস্থা উন্নত হবে এবং বন্যার ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে মধ্যনগর বাজারও বাণিজ্যিকভাবে নতুন প্রাণ ফিরে পাবে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, সুনামগঞ্জের প্রায় ১৯টি নদী খননের পরিকল্পনা রয়েছে।

এর মধ্যে ১২টি নদী সমন্বিত ড্রেজিং প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শুমেশ্বরী নদীও সেই সমন্বিত ড্রেজিং প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে। অনুমোদন পেলেই খননকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...