দেশের তৈরি পোশাক খাতের বড় অংশ এখনো কটননির্ভর, যার সিংহভাগই আমদানি করতে হয়। এতে বছরে খরচ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। প্রতিযোগী দেশগুলোসহ বিশ্ব যখন নন-কটনে ঝুঁকছে, সেখানে আমদানিনির্ভর কটনের গণ্ডিতেই আটকে আছে বাংলাদেশ। এই অতিরিক্ত কটননির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে যেমন রপ্তানি বাজার সংকুচিত করছে, তেমনি শিল্পের মূল্য সংযোজনকেও বাধাগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ কারণে পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কটনের বিকল্প উৎসে মনোযোগী হওয়ার কথা বলছেন তারা। একই সঙ্গে তারা নন-কটনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্যমতে, বাংলাদেশের স্থানীয় চাষিরা বার্ষিক চাহিদার মাত্র ২ শতাংশেরও কম তুলা সরবরাহ করতে পারেন। বাকি ৯৮ শতাংশ উজবেকিস্তান, ভারত, ব্রাজিল, বেনিন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, তুলা আমদানিতে বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৫০০ কোটি ডলার। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আমদানির কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কটন আমদানিকারক হিসেবে পরিচিত। আর তুলা উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, দেশে
বার্ষিক তুলার চাহিদা প্রায় ৮৫ লাখ বেল। আর বাংলাদেশের উৎপাদনের পরিমাণ কমবেশি ২ লাখ বেল।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৭২.৭ শতাংশই কটননির্ভর, যা, বৈশ্বিক গড়ের (৪১.৬ শতাংশ) প্রায় দ্বিগুণ। ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক হয়েও এখনো কটননির্ভর রয়ে গেছে বাংলাদেশ। তালিকায় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি নির্ভরশীল শুধু পাকিস্তান ও ভারত। এর মধ্যে পাকিস্তানের পোশাক রপ্তানিতে কটনের অংশ ৮৫.১ ও ভারতের ৭৪ শতাংশ। বিপরীতে ভিয়েতনামের কটনভিত্তিক রপ্তানি ৩৪.৮ শতাংশ, চীনের ২৯.৪ এবং কম্বোডিয়ার ৪১.৯ শতাংশ।
আইটিসির তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর অনেকেই ম্যান-মেইড ফাইবার (কৃত্রিম তন্তু) পোশাকের দিকে অনেক বেশি এগিয়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গতি বেশ কম। ২০১৬ সালে দেশের পোশাক রপ্তানিতে ম্যান-মেড ফাইবারের অংশ ছিল ১১.৩ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে তা প্রায় ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে নিটওয়্যারের তুলনায় ওভেনে কটননির্ভরতা তুলনামূলক বেশি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক ইমরান কাদের তূর্য আমার দেশকে বলেন, বিশ্বব্যাপী কটনের চাহিদা বিবেচনা করলে দেখা যায়, এর বাজার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের বেশি নয়। অন্যদিকে, ফাস্ট ফ্যাশনের জনপ্রিয়তার কারণে বর্তমানে ৭০ শতাংশ চাহিদাই ম্যানমেড ফাইবারের দিকে ঝুঁকছে। আমাদের মূল দুর্বলতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে দেশের বস্ত্রশিল্প সম্পূর্ণ কটনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তবে পর্যায়ক্রমে ফাইবার থেকে ফেব্রিক ডেভেলপমেন্টের কাজগুলো যত দ্রুত করতে পারব, আমাদের জন্য তা ততই ইতিবাচক হবে।
পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা জানান, কটন দিয়ে তৈরি পোশাকের বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং এ থেকে উৎপাদিত পণ্যের দামও তুলনামূলক কম। অন্যদিকে, নন-কটন ও সিন্থেটিক পোশাকের মূল্য বা প্রফিট মার্জিন অনেক বেশি। কটন নির্ভরতা বাংলাদেশের এই বেশি মুনাফা অর্জনের সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে। এছাড়া এলডিসি পরবর্তী সময়ে শুল্ক সুবিধা উঠে গেলে তুলা রপ্তানিতে অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ দেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগী সক্ষমতা কমাতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
তবে ব্যবসায়ীদের কারো কারো মতে, দেশের পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে কটনভিত্তিক পণ্যে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। এই সক্ষমতা দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি এবং তা হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কটন ও ননকটন পণ্যে সক্ষমতা বাড়ানো সময়ের দাবি। পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া এই খাতে বড় ধরনের সক্ষমতা তৈরি করা সহজ হবে না বলেও মনে করেন তারা। উদ্যোক্তাদের মতে, দেশের পোশাকশিল্পের বর্তমান শক্তি বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন এবং প্রতিযোগিতামূলক দাম। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য নন-কটন ক্যাটাগরিতে সক্ষমতা নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ কারণে ম্যান-মেড ফাইবার, সিনথেটিক ও টেকনিক্যাল পোশাকে সক্ষমতা বাড়লে শুধু বেশি পোশাক রপ্তানি নয়, বরং বেশি মূল্য সংযোজনের দিকেও এগোতে পারবে দেশ।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউউদ্দিন রুবেল বলেন, পরিকল্পনা অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, জ্বালানি নিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ—এ চার বিষয় একসঙ্গে এগোতে না পারলে বাংলাদেশের নন-কটন তথা ম্যানমেড ফাইবারে উত্তরণের যাত্রা ধীরগতিতেই রয়ে যাবে, আর বিশ্ববাজারের সঙ্গে ব্যবধান বাড়তেই থাকবে।
রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণের জন্য দেশের বস্ত্র খাতকে ম্যানমেড ফাইবারের (এমএমএফ) পণ্যের দিকে যেতে হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেন, ম্যানমেড ফাইবার পণ্যে ভালো করতে হলে নিজস্ব কাঁচামাল হিসেবে ‘ফিলামেন্ট ইয়ার্ন’ লাগবে। কিন্তু আমরা অনেক ধরনের পলিয়েস্টার তৈরি করলেও ফিলামেন্ট ইয়ার্ন তৈরি করি না। বর্তমানে জ্বালানি পরিস্থিতি ভালো না হওয়ায় দেশে এটি তৈরি সম্ভব হচ্ছে না; তাই আপাতত চীন ও ভারত থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ম্যানমেইড ফাইবারে আমাদের যেতেই হবে— এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


