স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ সব ধরনের সুবিধা হারাবে না বলে জানিয়েছেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেন, উত্তরণের ফলে কিছু ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। এসব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স, প্রস্তুতি ও সক্ষমতা অর্জনে কাজ করছে সরকার। আগামী ২৪ মাসের মধ্যে বড় প্রস্তুতিগুলো শেষ করে বাকি সময়ে সমন্বয় ও বাস্তবায়নের দিকে নজর দেওয়া হবে।
সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) অডিটোরিয়ামে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল শিফট ইন দ্য পোস্ট-এলডিসি ইরা: স্ট্র্যাটেজিস ফর আইপিআর ইস্যুজ অব কি ইন্ডাস্ট্রিজ’ শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইআরডির সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রজেক্ট (এসএসজিপি) ও ডিসিসিআই যৌথভাবে এ আয়োজন করে।
শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর কোন কোন সুবিধা অব্যাহত থাকবে এবং কোথায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে, তা চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের করণীয়ও নির্ধারণ করা হচ্ছে। বিসিসিআই, এফবিসিসিআইসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সহযোগিতায় একটি রোডম্যাপ ও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরে আমরা কি সব সুবিধা হারাচ্ছি? আসলে সব সুবিধা হারাব না। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি দরকার।’
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনি দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান ইআরডি সচিব। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও মেধাস্বত্বের মতো বিষয়ে দেশের আলোচনাসক্ষমতা বাড়াতে সরকার কাজ করছে।
২৪ মাসে বড় প্রস্তুতি শেষের লক্ষ্য
এলডিসি উত্তরণের সময়সীমার পুরোটা অপেক্ষা না করে আগেই প্রস্তুতি শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানান শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘গত ২৪ মাসে আমরা যত ধরনের কমপ্লায়েন্স, রেডিনেস ও ইস্যু আছে, সেগুলো নিয়ে কাজ করে একটি পর্যায়ে যেতে চাই। বাকি ছয় মাসে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও অপারেশন সফল করার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করব।’
তিনি বলেন, কোনো আইন বা নীতি রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। একটি আইন সংশোধনের আগে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন, নীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। তাই প্রতিটি খাতের প্রয়োজন আলাদাভাবে পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসএমই ও গবেষণায় নজর
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান ইআরডি সচিব। ধোলাইখাল, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও ভৈরবসহ বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে বংশপরম্পরায় পণ্য তৈরি করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের শুধু সরকারি সহায়তা দিলেই হবে না; আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।
তার মতে, সামান্য নকশাগত পরিবর্তন, গুণগত মানোন্নয়ন ও মেধাস্বত্ব সুরক্ষার মাধ্যমে এসব পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। গবেষণা খাতে বরাদ্দ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না। অর্থ থাকলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ঘাটতিতে বরাদ্দ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ সমস্যা দূর করতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এলডিসি-পরবর্তী সময়ে দেশের শিল্পকে শুধু উৎপাদননির্ভর না রেখে উদ্ভাবন, ব্র্যান্ডিং, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মূল্য সংযোজনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে নিজস্ব মানদণ্ড তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব মান আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পাওয়ার মতো হতে হবে।
মেধাস্বত্বে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর মেধাস্বত্ব সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। বিশেষ করে ওষুধ, তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও শিল্প-নকশার মতো খাতে বিদ্যমান সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি, ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থা, দক্ষ জনবল এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মেধাস্বত্বের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী মেধাস্বত্ব ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা জরুরি। সম্ভাবনাময় শিল্পগুলোতে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর পরিবর্তে উদ্ভাবন, ব্র্যান্ডিং, প্রযুক্তি বিনিময় ও মূল্য সংযোজনের দিকে নজর দিতে হবে।
তিনি মেধাস্বত্ব আইনের কাঠামোগত দীর্ঘসূত্রতা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও বেসরকারি খাতে সচেতনতার অভাবকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে আইপি ট্রাইব্যুনাল চালু, ট্রেডমার্ক নিবন্ধনে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগের প্রস্তাব দেন তিনি।
আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ ও বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা (ডব্লিউআইপিও) একাডেমির সাবেক পরামর্শক মোহাম্মদ আতাউল করিম। তিনি বলেন, এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতায় মেধাস্বত্ব অধিকারকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে হবে। ওষুধ, সফটওয়্যার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও শিল্প-নকশায় ট্রিপস ও সম্ভাব্য ট্রিপস-প্লাস বাধ্যবাধকতা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এগুলো উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সুযোগও সৃষ্টি করবে।
অনুষ্ঠানে ইআরডির অতিরিক্ত সচিব ও এসএসজিপির প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম জাহাঙ্গীর, বিজিএমইএর সেক্রেটারি জেনারেল মেজর জেনারেল ড. মো. শাহেদুল ইসলাম (অব.), ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ফায়েজ আহমেদ, ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী রাইসুল কবির, আইপিএবির মহাপরিচালক এমদাদুল আজিজুর রহমান, বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমানসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

