রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের হোঁচট

রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের হোঁচট

রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনীতির শ্লথগতি ও এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনে জেরে বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ২৬ শতাংশ। কোভিডের বছর বাদ দিলে গত আড়াই দশকেও রাজস্ব আদায়ে এতে কম প্রবৃদ্ধির ঘটনা ঘটেনি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি হলেও তার পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ১২ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

করোনার অভিঘাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছিল। ওই অর্থবছরের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির বিষয়টি ব্যতিক্রম বিবেচনা করলে গত আড়াই দশকের মধ্যে রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে গত বিদায়ী অর্থবছরে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল চার লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বছরের মাঝপথে লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে তা চার লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বছর শেষে এনবিআর তিন লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েও বছর শেষে ৯২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) চার লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় হয়েছিল তিন লাখ ৬২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় বেড়েছে আট হাজার ৭৭ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

এনবিআরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত আড়াই দশকের মধ্যে পূর্ববর্তী অর্থবছরের আহরণের ওপর পরবর্তী অর্থবছরের আদায়ে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০১০-১১ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। সাধারণত রাজস্ব আদায়ে ১১ থেকে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়ে আসছিল। কিন্তু বিদায়ী অর্থবছরে তাতে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। অবশ্য রাজস্ব আদায়ে সবশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পেরেছিল এনবিআর। এরপর থেকে রাজস্ব আদায়ে আর লক্ষ্য ছুঁতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত অর্থবছরের শুরুতেই রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়ে দেশ। কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জুনের শেষ সপ্তাহে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। জুলাইয়ের শুরুতে সে আন্দোলন ধীরে ধীরে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। অর্থবছরের শুরুতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীদের দেশ ছেড়ে পালানো, আত্মগোপনে চলে যাওয়া কিংবা গ্রেপ্তারের কারণে দেশের অর্থনীতির বিদ্যমান কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও তার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।

অন্যদিকে অর্থবছরের শেষ দুই মাস অর্থাৎ মে ও জুন মাসে বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি রাজস্ব আদায় হয়। কিন্তু গত মে মাসে এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি আলাদা বিভাগ গঠনে অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। অধ্যাদেশের বিরোধিতা করে আন্দোলন শুরু করে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একপর্যায়ে তারা এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ফলে ওই সময় রাজস্ব আদায়ে কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান আদায় কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকারও করেছেন। ফলে বিদায়ী অর্থবছরের বড় একটি সময়ই অস্থিরতায় কেটেছে। ফলে সার্বিকভাবে রাজস্ব আদায়ে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. এম মাসরুর রিয়াজ আমার দেশকে বলেন, রাজস্ব আদায় কম হওয়ার মূল কারণই হচ্ছে অর্থনীতির শ্লথগতি। বাংলাদেশের গত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে গত অর্থবছরে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সর্বনিম্ন বাস্তবায়ন হয়েছে গত ২০ বছরের মধ্যে। সরকারের ব্যয় থেকে বড় ধরনের রাজস্ব আয় হয়ে থাকে। কিন্তু ব্যয় কম হওয়ায় সরকারের রাজস্ব আদায়ে তার বড় প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগের পরিমাণও কমেছে। সরকারের আমদানির পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কিছু নিত্যপণ্যের ওপর থেকে শুল্ক কমানো হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের প্রভাবও রাজস্ব আদায়ে পড়েছে বলে জানান তিনি। এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি যথার্থ নয় বলেও মন্তব্য করেন এ বিশ্লেষক। তিনি বলেন, সাধারণত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে এনবিআরকে রাজস্ব আহরণের একটা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সেটি অর্জনের সক্ষমতা এনবিআরের রয়েছে কি না, সেটা যাচাই করা হয় না। সরকার বাজেট তৈরির সময় তার ব্যয় নির্ধারণ করে। সে ব্যয় নির্বাহে রাজস্ব আদায়ে এনবিআরকে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এ ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ তৈরির সংস্কৃতির অবসান হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন