বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি আরো তলানিতে এসে ঠেকেছে। চলতি বছরের জুন শেষে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৪০ শতাংশে, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ছাত্র-জনতার বিপ্লবে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে বলে মনে করছেন ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যমতে, গত মে মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। জুনে তা কমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৪০ শতাংশে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ৯ দশমিক ৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। এপ্রিলে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, মার্চে ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদহার হার অনেক বেশি। আবার গত দেড় বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে একটা টালমাটাল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্পের শুল্কনীতি। চলমান রাজনৈতিক সংকটে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই আইসিইউতে রয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ ও ব্যাংকিং নানারকম জটিলতার সঙ্গে ভুল নীতিও নেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ বিনিয়োগের চিন্তাও করছে না। তাই বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান আমার দেশকে বলেন, জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের লক্ষ্যমাত্রা যেটা ছিল, সেখান থেকে তা অনেক কম আছে। মূল্যস্ফীতি সামান্য কমা ও রিজার্ভ বৃদ্ধিতে আমদানি সক্ষমতা বাড়লেও বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে কোনো চাঞ্চল্য দেখাচ্ছে না। এতে অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দরিদ্রতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ম্যাক্রো ইকোনমির (সামষ্টিক অর্থনীতি) কিছু কিছু জায়গায় উন্নতি হলেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে না। মূলত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে তারা আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে না। নির্বাচন নিয়ে রোডম্যাপ ঘোষণা করলেই এ অনিশ্চয়তা কেটে যাবে বলেও জানান তিনি।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এখন ব্যক্তিখাতে ঋণের চাহিদা কম। ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হবে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে কিছু ব্যাংক তারল্য সংকটে আছে। পাশাপাশি সরকারও ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে। ব্যাংকগুলো সরকারকে ঋণ দেওয়া অপেক্ষাকৃত নিরাপদ করায় সেখানে বেশি বিনিয়োগ করছে। আমাদের যদি বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হয়, তাহলে আমদানি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি বাড়াতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে যেতে পারেন। এতে বাজারে তারল্য বাড়বে এবং ব্যাংকগুলোর ডিপোজিটও বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে আমদানির এলসি খোলার পরিমাণ ২.৯৮ শতাংশ এবং নিষ্পত্তির পরিমাণ ৬.০৮ শতাংশ বেড়েছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায়। এ সময়ে আমদানি এলসি খোলা হয়েছে ৫৮.৯৪ বিলিয়ন ডলারের এবং নিষ্পত্তি হয়েছে ৫৮.৮২ বিলিয়ন ডলারের। তবে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ খাতে এলসি খোলায় ও নিষ্পত্তিতে এই সময়ের মধ্যে যথাক্রমেÑ২৭.৪৬ শতাংশ এবং ২৫.৫৬ শতাংশ হ্রাস দেখা গেছে।
এদিকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড চার লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ২৫ শতাংশ। এতে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে গুরুতর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর আগে গত কয়েক মাস ধরেই বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি লক্ষ করা গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৭.১৫ শতাংশ, ডিসেম্বরে ৭.২৮ শতাংশ, নভেম্বরে ৭.৬৬ শতাংশ, অক্টোবরে ৮.৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৯.২ শতাংশ, আগস্টে ৯.৮৬ শতাংশ, জুলাইয়ে ১০.১৩ শতাংশ এবং জুনে ২০২৪-এ ৯.৮৪ শতাংশ ছিল প্রবৃদ্ধির হার।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


