দেশের বাজারে ফলমূল ও নিত্যপণ্যের প্রকৃত দামের সঙ্গে ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা দরের বড় ধরনের অমিল দেখা গেছে। বিশেষ করে রোগীর পথ্য ফলের ক্ষেত্রে কমিশনের দেওয়া দরের সঙ্গে খুচরা বাজারের ব্যবধান অনেক বেশি। এতে একদিকে ভোক্তাদের মধ্যে বাজারদর নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভুল তথ্যের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপও প্রত্যাশিত কার্যকারিতা পাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ট্যারিফ কমিশনের দাবি, পাইকারি বাজারের দর বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাজারদর বলতে সাধারণত খুচরা বাজারের দামকেই বোঝানো হয়। এ অবস্থায় কমিশনের প্রতিবেদনে কোন পর্যায়ের বাজারদর প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ৩ অক্টোবর ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (ট্যারিফ) পক্ষ থেকে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতি কেজি আপেলের দাম ২৮০ থেকে ৩৮০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। মাল্টা প্রতি কেজি ২১০ থেকে ৩২০ টাকা, কমলার দাম ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং আঙুরের দাম ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাজারের চিত্র উল্টো। আলোচ্য সময়ে দেশের বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ছিল ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকা। গতকাল রোববার রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউনহল বাজারে প্রতি কেজি মাল্টা ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কাপ্তানবাজারে প্রতি কেজি মাল্টা ৩২০ থেকে ৩৬০ টাকায়। আর যশোরের বেনাপোলে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ছিল ৩৫০ টাকা। গতকাল টাউনহলে বাজারে প্রতি কেজি আপেলের দাম ছিল ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা। আর যশোরে ছিল ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকা। কাপ্তানবাজারে প্রতি কেজি আঙুরের দাম ছিল ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা। টাউনহল বাজারে প্রতি কেজি আঙুর বিক্রি হয়েছে ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকায়। আর বেনাপোলে ছিল ৪৫০ টাকা। প্রতি কেজি কমলা বেনাপোলে বিক্রি হয়েছে ৪০০ টাকা, টাউনহল বাজারে ৪২০ টাকা এবং কাপ্তানবাজারে ৩৫০ টাকা থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ফলে বাজার ঘুরে ট্যারিফ কমিশনের দেওয়া মূল্যের সঙ্গে বাজারে ফলের দরের বিশাল ফারাক দেখা গেছে।
অন্যদিকে প্যাকেটের প্রতি কেজি চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১১০ টাকা। কিন্তু মুদি দোকানগুলোয় চিনি কিনতে গেলে ভোক্তাকে দাম গুনতে হচ্ছে ১২০ টাকা। একই অবস্থা বোতলজাত সয়াবিন তেলের দামেও। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাজারে খুচরা বাজারে ২১০ টাকার কমে তেল বিক্রি হচ্ছে না। এসব বৈঠকে তেল, চিনি, খেজুরসহ বেশ কিছু পণ্যের ওপর বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন বরাবরের মতোই বর্তমান বাজারদর, শুল্কস্তর, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। এখানে গত সপ্তাহের সোমবার অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তেল ও চিনির বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। যে উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, বাজারে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০৪ টাকায়, অথচ বাজারে সুপার শপগুলো ছাড়া অধিকাংশ মুদি দোকানেই এই তেল ২১০ টাকার নিচে নেই। একইভাবে বলা হয়েছে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায়। অথচ বাজারে নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য থাকার পরও প্রতি কেজি বাড়তি ১০ টাকা গুনতে হচ্ছে ভোক্তাকে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই তেল-চিনির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিশেষভাবে যোগসাজশ করে তাদের পক্ষে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠায় ট্যারিফ কমিশন। কমিশনের একটি চক্র এই কাজে জড়িত। এই চক্রের দৌরাত্ম্য থামাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য একাধিক উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। একাধিক সংস্থা দিয়ে তেল-চিনির প্রকৃত মূল্য কত হবে সেটা বের করার চেষ্টা করেছে মন্ত্রণালয়। তবে এখনো প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রকৃত মূল্যায়ন পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির-উদ-দৌলা আমার দেশকে বলেন, সাধারণত আড়তদার বা পাইকারি বাজারের দরের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। তবে পাইকারি দামের সঙ্গে খুচরা দামের পার্থক্য এতটা বেশি হওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে পাইকারি ও খুচরা বাজারের তথ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে ‘বাজারদর’ বলতে সব সময় চূড়ান্ত খুচরা দামকেই বোঝানো হয়। সাধারণত ঢাকা মহানগরীর ১৩টি প্রধান বাজারের দরকে গড় করে একটি প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। তিনি বলেন, ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে খুচরা বাজারকে অবশ্যই আমলে নিতে হবে। তা না হলে বাজারের প্রকৃত চিত্র কখনোই মিলবে না এবং সরকারের কোনো বাজার নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াই মাঠপর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

