সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানিসংকট ও কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হতে পারেন। একই সঙ্গে উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকিতে থাকা দরিদ্র পরিবারগুলো দুর্যোগের ক্ষতি সামাল দেওয়া ও পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং আর্থিক অসামর্থ্য—দুইয়ের চাপে এসব মানুষের দুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বুধবার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রকাশিত এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্কস অন দ্য রাইজ—অ্যাকশনস ফর আ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার শীর্ষক প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলীয় জলবায়ু ঝুঁকি, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলীয় বন্যার ক্ষতি বর্তমানের কাছাকাছি পর্যায়ে সীমিত রাখতে বছরে ৯ বিলিয়ন থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। এ অর্থ ব্যয় করা গেলে বছরে ১৭৮ বিলিয়ন থেকে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে, কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা না নিলে ২১০০ সালের মধ্যে উপকূলীয় বন্যায় বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি বেড়ে ৭৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার।
৩০টি উপকূলীয় অর্থনীতির হিসাবের ভিত্তিতে এডিবি জানিয়েছে, অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে বার্ষিক বন্যার ক্ষতি বর্তমানের তুলনায় ছয় গুণের বেশি এবং শতাব্দীর শেষ নাগাদ প্রায় ২০ গুণ হতে পারে। ২০৫০ সালে ক্ষতির পরিমাণ ১৭২ বিলিয়ন থেকে ১৯৯ বিলিয়ন ডলার এবং ২১০০ সালে ৫২০ বিলিয়ন থেকে ৭৩৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু উপকূলীয় অবকাঠামো ও সম্পদের ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানির সংকট এবং কৃষি উৎপাদন হ্রাস মানুষের বসবাস ও জীবিকার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। এর ফলে দেশের ভেতরে এক স্থান থেকে অন্যত্র মানুষের স্থানান্তরের প্রয়োজন বাড়তে পারে।
এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হতে পারেন। তবে প্রতিবেদনের প্রকাশিত সারাংশে এ হিসাবের ভিত্তিবছর, নির্দিষ্ট অঞ্চল কিংবা অভিবাসনের সংজ্ঞা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
এ ধরনের স্থানান্তর বাড়লে আবাসন, কর্মসংস্থান, নগরসেবা ও অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে বসতভিটা বা জীবিকার উৎস হারানো দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য নতুন জায়গায় বসবাস এবং আয়-রোজগারের ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের উপকূলীয় এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্বল অবস্থার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এসব দেশে বন্যার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর আর্থিক সামর্থ্য তুলনামূলকভাবে কম। ফলে দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতি, তাৎক্ষণিক ক্ষতি মোকাবিলা এবং পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ক্ষেত্রে তারা বেশি বাধার মুখে পড়ে। অর্থাৎ, জলবায়ু ঝুঁকির পাশাপাশি দারিদ্র্যও তাদের সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা থেকে বছরে প্রায় ৭ লাখ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। বন্দর, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন ও ঐতিহ্যবাহী স্থানের পাশাপাশি বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাসের কারণে এসব অঞ্চল আঞ্চলিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তীব্রতর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে পড়ছে।
এডিবির তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির উপকূলরেখাবিশিষ্ট উন্নয়নশীল সদস্যদেশগুলোতে ৪০ কোটির বেশি মানুষ সমুদ্র থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করেন। এ সংখ্যা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও বেশি। ফলে উপকূলীয় বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগের প্রভাব অবকাঠামো বা সম্পদের ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; মানুষের জীবন-জীবিকা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে।
এডিবির জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের মহাপরিচালক ইয়েভগেনি ঝুকভ বলেন, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি উপকূলীয় এলাকাগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান দুর্যোগের কারণে সংকুচিত হচ্ছে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে দীর্ঘমেয়াদি, অভিযোজনযোগ্য ও ঝুঁকিভিত্তিক সমাধান গ্রহণের এখনই সময়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকক, জাকার্তা, কলকাতা ও মুম্বাইয়ের মতো বড় উপকূলীয় শহরে অতীতে যে ধরনের বন্যা শত বছরে একবার ঘটত, শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা প্রতিবছরের ঘটনায় পরিণত হতে পারে। এতে নগর অবকাঠামো, আবাসন, পরিবহন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া বন্দর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কারণে এ অঞ্চলে বছরে ৪০ বিলিয়ন থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে বন্দরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে এ ধরনের বিঘ্নের প্রভাব সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সীমানা ছাড়িয়ে আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বড় অর্থনীতিগুলো মোট আর্থিক ক্ষতির হিসাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে তুলনামূলকভাবে ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উচ্চমাত্রার গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে প্রবালপ্রাচীরবেষ্টিত নিম্নভূমির দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে বার্ষিক বন্যার ক্ষতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩০ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
উপকূলীয় সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানোর কৌশল হিসেবে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে এডিবি। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, বছরে ৯ বিলিয়ন থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে বন্যার ক্ষতি বর্তমানের কাছাকাছি পর্যায়ে সীমিত রাখা সম্ভব হতে পারে। এর বিপরীতে বছরে ১৭৮ বিলিয়ন থেকে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি এড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগের তুলনায় সুফল ২০ গুণ পর্যন্ত হতে পারে।
এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারগুলোকে এমন পরিকল্পনা নিতে হবে, যাতে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যও বিবেচনায় থাকে। জলবায়ু পরিস্থিতি, ঝুঁকি ও বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতি সংশোধনের সুযোগ রাখাও জরুরি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উপকূলীয় সহনশীলতা বাড়াতে চারটি প্রধান পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে এডিবি। এগুলো হলো—উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা; সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সুশাসন শক্তিশালী করা; প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সংগ্রহ এবং বিনিয়োগের পরিসর বাড়ানো; আর গৃহীত উদ্যোগের বাস্তবায়ন ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা।
উপকূলীয় জলবায়ু অভিযোজনের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় অর্থনীতিগুলোতে আন্তর্জাতিক অভিযোজন অর্থায়ন ছিল প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২২ ও ২০২৩ সালে এর বার্ষিক গড় বেড়ে ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, এ সময়ে অর্থায়ন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তারপরও বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
এ ঘাটতি পূরণে সরকারি অর্থায়নকে মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সহজ শর্তে ঋণসহ বিভিন্ন উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এডিবির মতে, উপকূলীয় সুরক্ষায় বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়নব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগজনিত ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

