বিশ্ববিখ্যাত নামিদামি ব্রান্ডের বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করছেন কিন্তু আয়কর নথিতে তা গোপন রেখেছেন কিংবা আয়কর রিটার্নই জমা দেননি— এ ধরনের মালিকদের সন্ধানে নেমেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কর ফাঁকি দিতে এসব বিলাসবহুল গাড়ির মালিকরা তাদের আয়কর নথিতে গাড়ির তথ্য গোপন রেখেছে বলে এনবিআর কর্মকর্তারা মনে করছেন।
এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এ ধরনের ১৭৪৮টি গাড়ির মালিকের খোঁজ পেয়েছে যাদের মধ্যে ১ হাজার ৩৩৯টি গাড়ির মালিক আয়কর নথিতে এসব বিলাসবহুল গাড়ির তথ্য গোপন করেছেন এবং ৪০৯টি গাড়ির মালিক তাদের আয়কর রিটার্নই জমা দেননি।
এসব গাড়ির মধ্যে রয়েছে— ল্যাম্বরগিনি, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ, রোলস রয়েস, ল্যান্ড রোভার, অডি, রেঞ্জরোভার, পোরশে, জাগুয়ার, বেন্টলি, ক্যাডিলাক, মাসেরাতি, টেসলা, ফেরারি, টয়োটা, জিপের মতো নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি।
রাজস্ব বোর্ডের সিআইসি এবং কর বিভাগের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, এসব গাড়ির প্রতিটির দাম করসহ ১ কোটি টাকা থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, নামিদামি ব্র্যান্ডের এসব গাড়ির অধিকাংশেরই মালিক হচ্ছেন বিগত শেখ হাসিনার আমলে ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীরা। কর ফাঁকি দিতে আয়কর রিটার্নে গাড়ির তথ্য গোপন করা হলেও এসব গাড়ি ক্রয়ে অবৈধ অর্থ ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সিআইসি সূত্রে জানা গেছে, ৫ হাজার ৪৮৯টি বিলাসবহুল গাড়ির মধ্যে ৫ হাজার ২৮৮টির তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২ হাজার ৭১৯ জন মালিক তাদের রিটার্নে গাড়ির তথ্য প্রদর্শন করেছেন। অপরদিকে ৪৪২টি গাড়ির মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। ১৪৮ জন গাড়ির মালিক চলতি করবর্ষে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। তাদের রিটার্ন পর্যবেক্ষণে রাখার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া আয়কর আইনের ৬৭ (১২) ধারা অনুযায়ী ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা থাকায় তাদের আয়কর নথিও যাচাই করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিলাসবহুল গাড়ির মালিকের তথ্য গোপন ও তাদের আয়কর ফাঁকির অনুসন্ধানের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সিআইসির মহাপরিচালক আহসান হাবিব। তিনি বলেন, এসব গাড়ির মালিকদের কাছে ট্যাক্স-সংক্রান্ত নোটিস সার্ভ করতে সংশ্লিষ্ট ট্যাক্স অফিসগুলোকে জানানো হয়েছে। সাধারণত এসব উচ্চ মূল্যের গাড়ির উপর আমদানি শুল্ক ও কর অত্যন্ত বেশি। বাংলাদেশে আমদানিকৃত বিলাসবহুল গাড়ির ট্যাক্স সিসি-ভেদে সর্বোচ্চ ৮০০ শতাংশ পর্যন্ত। এছাড়া এসব গাড়ি নিবন্ধনের সময় অগ্রিম কর পরিশোধও করতে হয়।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, যে অর্থ দিয়ে ওই গাড়ি ক্রয় করা হয়েছে, তা ট্যাক্স ফাইলে দেখানো হয়নি। বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী, ব্যক্তির আয়ের ওপর কর ধার্য হয়। তাই ওই ব্যক্তি যে পরিমাণ অর্থ দিয়ে গাড়ি ক্রয় করেছেন, এটিকে আয় হিসেবে গণ্য করে ওই অর্থের উপর ট্যাক্স হবে। কোনো ব্যক্তি তার গাড়ি ট্যাক্স ফাইলে না দেখানোর অর্থ হলো, তিনি সেটির ক্রয়মূল্য গোপন করেছেন, যার ওপর কর প্রযোজ্য হবে।
বাংলাদেশে গত পাঁচ বছরে একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ আয়কর ছিল ৩০ শতাংশ। সে ক্ষেত্রে তিনি সর্বোচ্চ করের আওতায় পড়বেন এবং ৫ কোটি টাকার ৩০ শতাংশ হিসেবে কর দিতে হবে প্রায় দেড় কোটি টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হবে প্রতি বছরের জন্য ১০ শতাংশ জরিমানা। অর্থাৎ যদি কেউ পাঁচ বছর ধরে একটি গাড়ি ট্যাক্স ফাইলে না দেখিয়ে থাকেন, তাহলে তার মূল ট্যাক্সের বাইরে জরিমানা হবে আরো কমপক্ষে ৫০ শতাংশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

