শিশুর ভবিষ্যৎ : ভোগ না মূল্যবোধ

শিশুর ভবিষ্যৎ : ভোগ না মূল্যবোধ
প্রতীকী ছবি

সন্তান-সন্ততি মানব সমাজের প্রাণ। সব মানবের ক্ষেত্রেই সন্তানের প্রতি বিশেষ টান, সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা এবং সন্তান না পাওয়ার বেদনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সংসার জীবনে গাছ যেমন ফুল-ফলবিহীন হলে ভালো দেখায় না, ঠিক তেমনি সন্তানবিহীন সংসার অনেকটা মরুভূমির মতো। এখানে যদি সন্তানাদি না থাকে, তাহলে প্রাণ, স্পন্দন, আনন্দ, হিল্লোল এবং মায়াজাল—এসবের অভাব থেকেই যায়। কেমন সন্তান চাই? বিশাল জিজ্ঞাসা! সন্তানকে কোথায় দেখতে চাই? অথবা অভিভাবক হিসেবে বর্তমান সময়ে সন্তানের কাছে যা আশা করছি, তা কতটুকু যৌক্তিক? সন্তানের মাঝে ত্যাগ, জবাবদিহি এবং মূল্যবোধের চর্চার বিকাশ ঘটাতে চাই, নাকি ভোগবাদী ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের ব্রতী হব—এমনটা ভাবার বিষয়। আমাদের সন্তান আমাদের ভবিষ্যৎ। সন্তানরা বড় হয়ে নিজ দেশ এবং মাতৃভূমির কল্যাণে এগিয়ে আসবে, নাকি বাবা-মাকে অবজ্ঞা করে নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে? এসবে অভিভাবক হিসেবে আমাদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

শিশু জন্মদান থেকে বেড়ে ওঠা—এই বিশাল পথচলায় নানা বাধাবিপত্তি, স্বাভাবিকতা-অস্বাভাবিকতা, আনন্দ এবং প্রশান্তি—এসব ধাপের মুখোমুখি হতে হয়। সন্তান জন্মদান থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত নানা ধরনের সামাজিকীকরণ, ভালো-মন্দ ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ হওয়ার লক্ষ্যে দিন-রাত সজাগ থাকতে হয়। এখানে বিনিয়োগ জরুরি। হাদিসেও বলা আছে, ‘সর্বোত্তম ব্যয় হলো সেই ব্যয়, যা একজন ব্যক্তি তার পরিবারের জন্য করে।’ (মুসলিম : ৯৯৪) এসব করতে গিয়ে পাছে ভুল করছি না তো? অতিরিক্ত মনোযোগ, আহ্লাদ এবং ভবিষ্যৎ মানুষের বদলে উৎপাদনশীল প্রাণী তৈরিতেই কি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি? শিশুকে ভালো স্কুলে পড়াতে হবে, ভালো খাবার খাওয়াতে হবে, গায়ে যেন মশার আঁচড়ও না পড়ে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে, ফল ভালো হতে হবে, একাধিক গৃহশিক্ষক রাখতে হবে, খাওয়ার সময় দেখে দেখে ভালোগুলো তার পাতে দিতে হবে এবং সবসময় তার প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে হবে—এসব কি তাকে ভোগবাদী, অবাস্তব এবং অমানবিক রূপে রূপান্তরিত করছে না? কেন এমন করছি? আর দশটা শিশু যেভাবে স্বাভাবিক প্রবণতায় বেড়ে ওঠে, তাকে সেই সুযোগ কেন দিচ্ছি না? এ কেমন আচরণ?

বিজ্ঞাপন

সন্তান-সন্ততি আল্লাহর অশেষ নিয়ামত। সৎ এবং চরিত্রবান সন্তান যেকোনো বাবা-মায়ের পরম চাওয়া। অথচ এসবের পূর্বশর্ত—ধর্মীয় অনুশাসনের দীক্ষা, জবাবদিহি, সামাজিকতা, মানবিকতা, শ্রদ্ধা, স্নেহ এবং ভালোবাসার চর্চায় কেন এত অবহেলা? পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য এবং সুখ-শান্তির বাহন ও উপাদান।’ (সুরা কাহফ : ৪৬) দার্শনিক সক্রেটিসের মন্তব্যও এখানে বেশ মানানসই—‘সম্পদের আধিক্য মানুষকে সুখী করে না, সদগুণই প্রকৃত সুখের উৎস।’ এসবে অভিভাবক সমাজের উদাসীনতা কী ইঙ্গিত বহন করে? এই নিয়ামতের যদি যথাযথ চর্চা এবং বিনিয়োগ না করা হয়, তাহলে শেষমেশ চরম মূল্য দিতে হবে। ভালো মানুষের বড় প্রয়োজন—যেখানে ত্যাগ এবং জবাবদিহির উপস্থিতি থাকবে। এসবের ঘাটতির প্রভাবে বাবা-মা, সমাজ ও সংস্কৃতি সন্তানের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভে ব্যর্থ হবে। যার কারণে দেখা যায়, বাবা-মাকে অবজ্ঞা, অবহেলা, এমনকি খুনের শিকারও হতে হয়। নিজ সন্তানের কাছ থেকে এমন আচরণ কতটা পীড়াদায়ক, তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। এ প্রসঙ্গে কোরআনের সুরা আনফালের ২৮ নম্বর আয়াতে বলা আছে, ‘জেনে রেখো, ধন-সম্পত্তি ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্য এক মহাপরীক্ষা।’

অভিভাবকের মনোজগতে পরিবর্তন প্রয়োজন। সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে হোক—এই বিভাজন না করে তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই প্রধান ব্রত হওয়া উচিত। সন্তানকে শেখাতে এবং বোঝাতে হবে তার দায়, কর্তব্য এবং জবাবদিহি। অতিরিক্ত চাওয়া পরিহার করতে হবে। শুধু স্কুল, টিউশন, পড়ার টেবিল, ভালো পোশাক এবং বিদেশি ডিগ্রিই একমাত্র গন্তব্য নয়। মূল্যবোধ, ধর্মীয় শিক্ষা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, স্নেহ—প্রতিবেশী, অসুস্থ এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হবে, তা শেখাতে হবে। নাগরিক হিসেবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জানাতে হবে। এসবই আসল, বাকি সবই নকল। সন্তান যদি বাবা-মা এবং দেশকে আপন মনে না করে, নিজ এবং পরিবারকে নিয়েই শুধু মেতে থাকে, তাহলে অবক্ষয় অনিবার্য।

প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মাঝে লাগাম টানতে হবে। সন্তানের আগ্রহ এবং মেধাকে মূল্যায়ন করে তাকে ভবিষ্যৎ উপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে সময় দিতে হবে। জোর করে চাপিয়ে দিয়ে ভালো কিছু আশা করা ঠিক হবে না। শিশুকে বোঝাতে হবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপ্তি। ভালো-মন্দ যখন বুঝতে পারবে, তখন তার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ হলো সামাজিকীকরণের প্রপঞ্চগুলোর অস্বাভাবিক ইউটার্ন। এখন খেলার মাঠ, সঙ্গী, বন্ধু-বান্ধব, ভালো বই, মূল্যবোধ এবং আদর্শের বড় সংকট। বর্তমান প্রজন্ম অনেকটা ভার্চুয়াল নেশায় বুঁদ। এসব ভাবা প্রয়োজন।

সময় এখনই এসব ভাবার! সন্তানকে আমরা কী হিসেবে দেখতে চাই—ভোগের পাত্র, না মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ? এই কঠিন সমীকরণের মাঝেই নিহিত শান্তি, স্বস্তি এবং আগামীর সম্ভাবনা। এখানে রুশোর পর্যবেক্ষণও অনেকটা প্রাসঙ্গিক—‘শিশুকে বস্তু নয়, মানুষ হিসেবে গড়ে তোলো।’ তথ্যপ্রযুক্তির এ সময় শিশুর নৈতিক মূল্যবোধ, জাগতিক শিক্ষা, আবেগীয় সমর্থন এবং যৌক্তিক সামাজিকীকরণ বেশ প্রয়োজন। এই যাত্রায় বাবা-মাকে তাদের বন্ধু হতে হবে। চেষ্টা করতে হবে সবকিছু জানার এবং বোঝার। এখানে বাবা-মায়ের চাওয়ায় যতি টানতে হবে। শুধু শিক্ষিত, বড় পেশাজীবী ও ভালো ডিগ্রির পেছনে না ছুটে স্বপ্ন দেখতে হবে—সন্তান হবে সৎ, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, সামাজিক এবং ধর্মীয় চর্চায় পারদর্শী ভালো মানুষ, যারা হবে সমাজের আদর্শ। আগামীর সন্তান ভোগের নয়, মূল্যবোধের হোক—এটাই আমাদের প্রার্থনা এবং আকাঙ্ক্ষা।

লেখক : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন