বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে, প্রতিবছর ঈদযাত্রায় মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ঝরে যায় কয়েকশ মানুষের তাজা প্রাণ। অথচ সচেতন হলে ঈদযাত্রাসহ সারা বছর সড়ক দুর্ঘটনায় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।
প্রতিটি উৎসবে বিশেষ করে, বছরে দুই ঈদে কোটি মানুষের স্থানান্তর হয়। এই স্থানান্তরের সঙ্গে মিশে আছে পরিবহন, চালক, মালিক আর সড়ক। নিয়ন্ত্রণহীন গতি, মুনাফা বা অধিক আয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং চালক-যাত্রী উভয়ের দায়িত্বহীন আচরণ সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। কোন রাস্তায় কোন গাড়ির গতিবেগ কত হতে হবে কিংবা চালক একটানা কত ঘণ্টা গাড়ি চালাবেন, সে বিষয়ে আমাদের ধারণা খুবই সীমিত। গাড়ির সর্বোচ্চ গতিবেগ কিংবা সে গতি কতটুকু পরিসীমায় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব, সে বিষয়ে বাস্তব শিক্ষার অভাব আছে চালকদের। গাড়ি বা রাস্তার বিষয়ে সাম্যক ধারণা ছাড়াই তারা গাড়ি চালান আপন গতিতে।
উৎসবের সময়ে স্বাভাবিকভাবেই ঘরে ফেরা মানুষের চাপ বাড়ে। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের চাপ থেকেই অধিক আয় করার অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই প্রতিযোগিতায় চালককে মালিকের প্রত্যাশা পূরণে মাত্রাতিরিক্ত সময় গাড়ি চালাতে হয়। চালকের চাকরির নিশ্চয়তা আর মালিকের অধিক মুনাফা একসূত্রে গাঁথা। অতিরিক্ত মুনাফার জন্য অতিরিক্ত ট্রিপ; আর অতিরিক্ত ট্রিপ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত গতি। অতিরিক্ত ট্রিপের কারণে ক্লান্ত চালকের আসনে অনেক সময় বসছেন হেল্পার। এতে অনেক সময় ঘটে দুর্ঘটনা। জীবন দিতে হয় অনেক মানুষকে।
এভাবেই গণপরিবহনে অব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকে। এতে যুক্ত হয় ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালক। পরিবহন যেন টাকার মেশিন আর চালক হচ্ছেন সেই মেশিনের চাবি। ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও এর চালকের অধিক ট্রিপ দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না, তা মালিক-চালক কারো কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। অদক্ষ চালক অপরিচিত রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ে নিঃসংকোচে বের হয়ে পড়েন। নির্দিষ্ট সময়ে গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করা কিংবা নির্দিষ্ট গাড়ির জন্য নির্দিষ্ট ড্রাইভার নিয়োগ করার সংস্কৃতি আজও আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। রাস্তায় পুরোপুরি বসে না যাওয়া পর্যন্ত গাড়ি গ্যারেজে যাবে না, এমন অসুস্থ চিন্তা সব গাড়ির মালিকের মধ্যেই দেখা যায়। এটাই আমাদের গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিক মুনাফার আশায় সিটি সার্ভিসের বাসগুলো দূরপাল্লার রাস্তায় নামানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতাও চলছে জোরেশোরে।
অধিক মুনাফালোভী মনোবৃত্তি থেকেই সৃষ্টি হয় এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর অব্যবস্থাপনা। কোন পরিবহন কত বেশি ট্রিপ দিল, তার এক প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। কিন্তু পরিবহন বা এর চালকের অধিক ট্রিপ দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না, তা নিয়ে ভাবার যেন ফুরসতটুকুও নেই। রাস্তায় যে পরিমাণ যাত্রীদের চাপ থাকে, সেই বাস্তবতায় প্রতিটি গাড়ি থামিয়ে লাইসেন্স আর ফিটনেস পরীক্ষা করা যেন এক আকাশকুসুম ভাবনা। অন্যদিকে ফিডার রোড থেকে মেইন রোডে উঠে আসছে গাড়ি, যারা না মানছে সংকেত, না কমাচ্ছে গতি।
নির্দিষ্ট স্টপেজ থেকে গাড়িতে ওঠা এবং নির্দিষ্ট স্টপেজে নামার মতো দায়িত্বশীল আচরণ সচরাচর যাত্রীদের মধ্যেও দেখা যায় না। সারা দেশেই ব্যস্ত সড়কে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীদের চলন্ত গাড়িতে উঠতে-নামতে দেখা যায়। চালকরাও এভাবে যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। থেমে থেমে যাত্রী ওঠানোর কারণে অপচয় হওয়া সময়কে সমন্বয় করতে দ্রুত গাড়ি চালানোর সময় তারা রাস্তায় খানাখন্দ থাকার কথা ভুলে যান। তাছাড়া, চালক ও পথচারীদের অনেকেই গাড়ি চালানোর বা রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলেন। এতেও প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। সড়কের ওপর অবৈধ হাটবাজার, ফুটপাত দখল এবং পথচারীদের অসচেতনতা ও অসাবধানতার কারণে প্রতিদিন ঝরে যাচ্ছে অনেক প্রাণ।
ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গাড়ি আর রাস্তাতেই কাটে চালক ও হেল্পারের জীবন। এই জীবন আমৃত্যু এভাবেই ছুটে চলে, যেখানে সামাজিকতার কোনো ছোঁয়া লাগে না। এই ব্যস্ত জীবনের পরিসরে নির্মল আনন্দ নেই, নেই কোনো স্বপ্ন; আছে শুধু নিত্যদিনের চাহিদা পূরণে বেঁচে থাকার যুদ্ধ। শতসহস্র যাত্রীকে নিরাপদে গন্তব্যে নিয়ে গেলেও ধন্যবাদ দেওয়ার মতো সৌজন্যবোধ কোনো যাত্রীর মধ্যে দেখা যায় না। এই কর্মব্যস্ততা, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, পারিবারিক সময়ের অভাব এবং সামাজিক মূল্যায়ন না পাওয়ার কারণে কিছু কিছু চালক জড়িয়ে পড়ছেন মাদকের জালে। অবহেলা ও অবজ্ঞার কারণে চালকদের মধ্যে পেশাদারিত্বের মনোভাব তৈরি হচ্ছে না।
প্রতিটি প্রাণ অমূল্য। একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্না। শুধু মুনাফাই মূল কথা নয়, জীবনের নিরাপত্তা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি গাড়ির মালিক, চালক ও যাত্রী—সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। তাই সড়কে প্রাণরক্ষা শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। চালককে তার পরিবহনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা এবং গতির সমন্বয়ের যোগ্যতা ও মানসিক স্থিরতাসম্পন্ন একজন সুস্থ মানুষ হতে হবে। তাদের সম্মান ও মর্যাদার জায়গাটি অনুধাবন করাতে হবে এবং সামাজিক জীবনের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে হবে।
গাড়ির গতিবেগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি একজন চালক দৈনিক কিংবা সপ্তাহে কত ঘণ্টা গাড়ি চালাবেন, তা নির্ধারণ করতে হবে। উন্নত বিশ্বে একজন চালক দিনে একটানা সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা গাড়ি চালাতে পারেন। প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে আমাদের দেশেও তা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে একটি স্মার্ট সিস্টেমে একটি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার থাকবে, যার অধীনে সব চালক সংযুক্ত থাকবেন। চালক তার ডিউটি শুরুর আগে আঙুল স্ক্যান করবেন এবং ডিউটি শেষ করার সময় আবার স্ক্যান করবেন। স্ক্যান না করলে ওই গাড়ি কেন্দ্রীয় ইউনিটে স্বয়ংক্রিয় সংকেত প্রেরণ করবে।
যাত্রীদেরও চালকের প্রতি আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে তাদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া আত্মবিশ্বাস বাড়াতে চালক ও হেল্পারদের উন্নত প্রশিক্ষণ, আলাদা পোশাক এবং কর্মজীবন শেষে মাসিক ভাতা দিতে হবে। গাড়িতে ওঠার সময় কুশলবিনিময় এবং নামার সময় চালককে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নেওয়ার সংস্কৃতিও গড়ে তোলা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট স্টপেজ থেকে গাড়িতে ওঠা এবং নির্দিষ্ট স্টপেজেই নামার অভ্যাস করতে হবে সবাইকে।
দুর্ঘটনার শিকার একটি পরিবার কী ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়, তা চালকদের সামনে তুলে ধরতে হবে। ‘১০ মিনিট আগে পৌঁছানোর চেয়ে ১০ বছর বেশি বেঁচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ’ তা বোঝার মানসিক সুস্থতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সুন্দর রাস্তা। গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধে লাইসেন্স এবং রুট পারমিট বাতিলের মতো কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সর্বোপরি মালিক, চালক ও যাত্রী সবাই আইন, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার বন্ধনে আবদ্ধ হলেই নিশ্চিত হবে নিরাপদ যাত্রা, উৎসবের সময়ের আনন্দও শোকে পরিণত হবে না।
বেপরোয়া গতির সঙ্গে দায়িত্বহীনতা, অসাবধানতা আর অসচেতনতায় ঝরে যাচ্ছে শত শত তাজা প্রাণ। দায়িত্ব যেখানে জীবনের সমান্তরাল, সেখানেই জমেছে অবহেলার পাহাড়। অস্থির উন্মাদনায় বিবেক আর বোধশক্তি যেন নীল আকাশে বিলীন। নিশ্চয়ই এ কান্না থামবে, এ আঁধার কাটবে আর বিবেকের আলোয় নিরাপদ হবে প্রতিটি প্রাণ।
লেখক : জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




