বাংলাদেশ হাজার বছরের সম্প্রীতির দেশ। এই ভূখণ্ডের ইতিহাস শুধু মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টানদের আলাদা আলাদা ইতিহাস নয়; বরং এটি পারস্পরিক সহাবস্থান, শ্রদ্ধা ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক অনন্য ইতিহাস। যুগের পর যুগ ধরে এই বাংলার মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও একই মাটি, একই নদী, একই সংস্কৃতি এবং একই সামাজিক বাস্তবতাকে ধারণ করে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে এসেছে। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস আজকের কোলাহলের চেয়ে অনেক পুরোনো এবং অনেক বেশি দৃঢ়। এই দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে এমন কিছু নীরব সাক্ষ্য, যা আধুনিক রাষ্ট্রের জন্মের আগে থেকেই সহাবস্থানের কথা বলে আসছে এবং সেই গল্পগুলো আমাদের নতুন প্রজন্ম ও সবার জানা দরকার।
পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায়, স্বামীবাগের সড়কে দাঁড়িয়ে আছে শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দির, যা স্বামীবাগ ইস্কন মন্দির নামে পরিচিত। তার ঠিক বিপরীতে, প্রায় গা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৩৫০ বছরের পুরোনো স্বামীবাগ জামে মসজিদ। দুই ধর্মের উপাসকরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই সরু রাস্তায় একে অন্যের পাশ দিয়ে হেঁটে গেছেন, যার যার উপাসনালয়ে, কেউ কাউকে বাধা দেয়নি। লালমনিরহাটের কালীবাড়ী এলাকায়, পুরান বাজার জামে মসজিদ ও কালীবাড়ী মন্দির একই উঠানে একে অন্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে শত বছরেরও বেশি সময় ধরে, প্রতিটি নিজ নিজ আচার পালন করে চলেছে অন্যের উপস্থিতি দ্বারা বিচলিত না হয়ে। মৌলভীবাজারের জুড়িতে, জাফরনগর ইউনিয়নের ভূঁয়াই বাজারে, মুসলমান ও হিন্দুরা একই মসজিদ-মন্দির প্রাঙ্গণে যার যার ধর্ম পালন করে আসছেন ৪৪ বছর ধরে। টাঙ্গাইলের নাগরপুরে, চৌধুরী বাড়িতে, মসজিদ ও মন্দির একই আঙিনায় ৬৩ বছর ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে, ইউসুফগঞ্জে, একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দিরের ১৫০ বছরের অবস্থান শুধু ধর্মীয় আচার নয়, সামাজিক সম্প্রীতিরও প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রংপুরের মিঠাপুকুরে, হিন্দু ও মুসলিম একই গেট দিয়ে প্রবেশ করেন—একজন মন্দিরের দিকে, আরেকজন মসজিদের দিকে। ঢাকার রমনা কালীমন্দির এবং তার পার্শ্ববর্তী আরো অনেক উদাহরণ এদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নীরব সাক্ষী হয়ে বিরাজ করছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা নয়। এগুলো এমন একটি সামাজিক চুক্তির প্রমাণ, যা লেখা হয়নি কোনো আইনের বইয়ে, বরং লেখা হয়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে, এমন এক চুক্তি, যা টিকে গেছে রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ঔপনিবেশিক রূপান্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং বিভিন্ন ধারার সরকারের কয়েক দশক পেরিয়ে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটের সঙ্গে এই ইতিহাস মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন, কারণ বর্তমানে প্রায়ই প্রসঙ্গ ছাড়াই বিরূপ মন্তব্য করা হয়। বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা জনসংখ্যার প্রায় ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ, রাষ্ট্রীয় এমন সুযোগ-সুবিধা পান, যা বিশ্বের অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া কঠিন। জন্মাষ্টমী, দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা এবং বড়দিন—সবই জাতীয় ছুটি হিসেবে পালিত হয়, এর পাশাপাশি প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের জন্য বছরে সর্বোচ্চ তিন দিনের ঐচ্ছিক ছুটিও রয়েছে নিজ নিজ ধর্মীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী উৎসব পালনের জন্য। বিভিন্ন দুর্দিনে তাদের পাশে সংখ্যা মুসলমানরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সুরক্ষা দান করে থাকে। শুধু দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বছরে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা দেশের প্রায় ৩২ হাজার মন্দিরের মধ্যে বিতরণ করা হয়। হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট বার্ষিক ১৪০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ পায়। সম্প্রতি সরকার ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জন্য বিদ্যমান ভাতার পাশাপাশি পুরোহিত, ভিক্ষু ও পাদরিদের জন্য মাসিক ভাতা চালুর পদক্ষেপ নিয়েছে । প্রায় ৯৯০টি মন্দির ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এখন মাসিক ভাতা পাচ্ছে—প্রধান পুরোহিত বা ভিক্ষু এবং সহকারী বা সেবাইতের মধ্যে ভাগ করে আট হাজার টাকা এবং সঙ্গে প্রধান ধর্মীয় উৎসবে দুই হাজার টাকার উৎসব ভাতা।
বিশ্বের দ্বিতীয় কোনো দেশ এমনকি পাশের দেশ ভারতেও খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য এই মাপের রাষ্ট্রীয় সহায়তা গড়ে উঠেছে। এমন কোনো দেশ খুঁজে পাওয়া আরো কঠিন হবে, যেখানে দেশের প্রতিটি ধর্মের প্রধান উৎসবের জন্য বেতনসহ সরকারি ছুটি দেওয়া হয় বা যেখানে অমুসলিম সম্প্রদায়কেও মুসলিম উৎসবের সমান উৎসব বোনাস দেওয়া হয়। তবু, এত কিছুর পরও, দেশটি সময় সময় দেখে যে কিছু গোষ্ঠী রাস্তায় নামে সংখ্যালঘু অধিকারের সংকট দাবি করে—এমন দাবি, যা প্রায়ই ওপরের লিপিবদ্ধ রেকর্ডের সঙ্গে মেলে না। এই প্যাটার্নটি সরাসরি খারিজ করার বদলে সততার সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন : এই কর্মকাণ্ডের কিছু অংশ বাস্তব, নির্দিষ্ট অভিযোগ প্রতিফলিত করে, যেগুলো নিজ গুণে শুনানির দাবিদার। কিন্তু এমন একটি ধারাও আছে এবং এখানেই যুক্তিবোধসম্পন্ন পর্যবেক্ষকরা তীব্রভাবে দ্বিমত পোষণ করেন, যা সমালোচকদের মতে একটি সত্যিকারের সংখ্যালঘু অধিকার আন্দোলনের চেয়ে বেশি কাজ করে বহিরাগত রাজনৈতিক স্বার্থের বাহন হিসেবে, বিশেষত এই অভিযোগ যে কিছু প্রচারণা ভারতীয় কৌশলগত স্বার্থের অথবা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রক্সি হিসেবে কাজ করে, যারা তৈরি করা অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক আলোচনায় পুনঃপ্রবেশের চেষ্টা করছে। অন্যরা এই কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন, যুক্তি দেখান যে এটি একটি অস্থির পরিবর্তনকালে সংখ্যালঘুদের প্রকৃত উদ্বেগকে খাটো করে এবং প্রমাণ ছাড়া বিদেশি উদ্দেশ্য আরোপ করে কর্মীদের অন্যায়ভাবে অবৈধ ঘোষণা করে।
যা অধিক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা যায় তা হলো : ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশের পরিবর্তনকাল যেকোনো মাপকাঠিতেই ভঙ্গুর এবং ভঙ্গুর পরিবর্তনকালেই সাম্প্রদায়িক বয়ান—সত্য বা অতিরঞ্জিত, স্বতঃস্ফূর্ত বা পরিকল্পিত—অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ক্ষমতা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বহন করে। সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাওয়া রাষ্ট্রযন্ত্র, ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক দখলের প্রবণতাযুক্ত গোয়েন্দা সংস্থা এবং পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিবেশ—সবই বিভিন্ন ধরনের অংশীজনদের জন্য উর্বর ক্ষেত্র বা সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি করে, যারা পরীক্ষা করতে চায় সাম্প্রদায়িক উদ্বেগকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার আগে কতদূর ঠেলে দেওয়া যায়। গভীরতর সত্য, যা লালমনিরহাট, সোনারগাঁ আর টাঙ্গাইলের সেই মসজিদ-মন্দির আঙিনাগুলো বহন করে, তা হলো—বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সহাবস্থান কখনোই কোনো নীতির আকস্মিক ফল ছিল না। এটি গড়ে উঠেছে সাধারণ পরিবারগুলোর পাশাপাশি বসবাসের মধ্য দিয়ে, বছরের পর বছর, প্রায়ই রাষ্ট্রের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই। এ ধরনের সম্প্রীতি স্থিতিশীল, কিন্তু অভেদ্য নয়—এটি পুনঃপুন তৈরি করা সংকটের বয়ানের সংস্পর্শে ক্ষয়ে যেতে পারে, ঠিক যেমন সত্যিকারের সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ক্ষয়ে যেতে পারে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের পরিবেশকে মাঝে মাঝে কিছু উগ্র, উসকানিমূলক এবং রাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠী নষ্ট করার চেষ্টা করে। তারা ধর্মকে ব্যবহার করে বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়, জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস ছড়াতে চায় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করার অপচেষ্টা চালায়। কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠদের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের, আবার কখনো সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠদের উসকে দিয়ে তারা রাজনৈতিক বা বিদেশি স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের সাধারণ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান জনগণ সংঘাত চায় না। তারা শান্তি, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের ধর্ম পালন করতে চায়। দেশের সাধারণ মানুষ জানে যে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের লাভ হয়, শুধু সেসব শক্তির, যারা বাংলাদেশকে দুর্বল, বিভক্ত এবং অস্থিতিশীল দেখতে চায়।
তাহলে ভবিষ্যতের কাজ হলো, সংখ্যালঘু সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের রেকর্ড রক্ষা করা এবং সংখ্যালঘু অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্যে একটি বেছে নেওয়া নয়। বরং দুটোই এমন কঠোরতার সঙ্গে করা, যাতে প্রকৃত অবিচার এবং রাজনৈতিক সুযোগসন্ধান—কোনোটাই অন্যটির আড়ালে আশ্রয় না নিতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকাল এই বিলাসিতা বহন করতে পারে না যে দুটির কোনো একটি অপরীক্ষিত থেকে যাবে।
বাংলাদেশের মাটি কখনো বিভেদের মাটি ছিল না। এটি এমন একটি ভূখণ্ড, যেখানে মসজিদের আজান, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, বৌদ্ধ বিহারের প্রার্থনা এবং গির্জার ঘণ্টা যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি ধ্বনিত হয়েছে। যারা এই ঐতিহ্যকে ভাঙতে চায়, তারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের আত্মাকেই আঘাত করতে চায়। তাই ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার—এই চেতনাকেই আরো শক্তিশালী করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
সুতরাং, যেকোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি, বিদ্বেষমূলক প্রচার কিংবা বিদেশি স্বার্থে পরিচালিত বিভাজনমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও জনগণকে সমানভাবে সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশের শক্তি তার বহুত্ববাদে, তার সহনশীলতায় এবং তার শতাব্দীপ্রাচীন সামাজিক সম্প্রীতিতে। এই সম্প্রীতি রক্ষা করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকেরও নৈতিক কর্তব্য।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



