পাগলা গারদের নিয়ন্ত্রণ যখন পাগলদের হাতে চলে যায়, তখন যা ঘটার তাই ঘটে? মনে হচ্ছে আমরা হয়তো সে রকম ঘটনাই দেখতে চলেছি, কারণ এমন কিছুই হয়তো ঘটছে। উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের এলাহাবাদ হাইকোর্ট অবশেষে তাজমহলের উৎপত্তিসংক্রান্ত একটি আবেদন কিছুদিন আগে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে এ বিষয়ে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে তাদের বক্তব্য জানতে চেয়েছে।
বেদনকারীরা ২০১৫ সাল থেকেই মামলাটি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু একের পর এক আদালত তা খারিজ করে দিচ্ছিল। অবশেষে এলাহাবাদ হাইকোর্ট তাদের আবেদন গ্রহণ করেছে।
অন্য আদালতগুলো কেন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চায়নি? কারণটা সম্ভবত সেটাই, যার জন্য অধিকাংশ বিচক্ষণ মানুষই আবেদনটির ভিত্তিহীন দাবিকে নিছক প্রলাপ বলে মনে করেন। এই আবেদনে তাজমহল নিয়ে সেই পুরোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বকেই তুলে ধরা হয়েছে, যা ঐতিহাসিক মহল বরাবরই উপহাসের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে। আবেদনকারীদের তত্ত্ব অনুযায়ী, তাজমহল একটি হিন্দু স্থাপত্য যা মোগলরা দখল করেছিল। আবেদনকারীরা শুধু এই তত্ত্বে বিশ্বাসই করেন না, তারা চান আদালত যেন ভবনটির ভেতরে সরেজমিনে তদন্তের অনুমতি দেয় এবং সেখানে মুসলমানদের নামাজ পড়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
তাদের এই দাবির সপক্ষে দেওয়া ‘যুক্তি’গুলোর বিস্তারিত বিবরণ এখানে তুলে না ধরে শুধু এটুকু বলব, এই দাবির মধ্যে নতুনত্ব খুব কমই আছে। দাবিটি এতটাই উদ্ভট যে, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া এর বিরোধিতা করেছে, বিরোধিতা করেছে ভারত সরকারও। আর এ কথা সবাই স্বীকার করবেন, নরেন্দ্র মোদির সরকার নিশ্চয়ই এমন কোনো হিন্দুবিদ্বেষী গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত নয়, যারা মোগলদের অন্যায্যভাবে কৃতিত্ব দিতে চায়।
প্রান্তিক গোষ্ঠীর আজগুবি গল্প
তাজমহল-সংক্রান্ত এই দাবির কথা আমি প্রথম শুনেছিলাম বহু দশক আগে স্কুলে পড়ার সময়। তখনই পিএন ওকের লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। তিনি ‘ইনস্টিটিউট ফর রিরাইটিং ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি’ (ভারতীয় ইতিহাস পুনর্লিখনবিষয়ক সংস্থা) নামে একটি সংগঠনের প্রধান ছিলেন।
ছোট বয়সে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রতি একধরনের আকর্ষণ কাজ করে। এরিখ ফন ড্যানিকেনের সেসব মতবাদ যেমন—আমাদের দেবতারা আসলে দূরবর্তী কোনো গ্রহের মহাকাশচারী ছিলেন, কিংবা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল অন্য কোনো জগতের প্রবেশপথ খুলে দেয় অথবা পল ম্যাককার্টনি মারা গেছেন এবং তার জায়গায় এক ‘ডাবল’ বা অবিকল দেখতে অন্য কাউকে বসানো হয়েছে—এসব যেমন আমাকে মুগ্ধ করত, তেমনই তাজমহল নিয়েও আমার মনে কৌতূহল জেগেছিল।
এরপর আমি পিএন ওক এবং তার মতো অনেকের লেখাপড়ার সময় খেয়াল করলাম, ওকের ঝুলিতে আরো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আছে, যার মধ্যে একটি ফতেহপুর সিক্রি নিয়ে। তার দাবি—এটি একটি হিন্দু শহর ছিল। আমি যেসব তত্ত্ব পড়েছি, তার প্রায় সবই এমন এক অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা, যেখানে বলা হয়, কঠোর পরিশ্রমী হিন্দুরা ভারতে অনেক গৌরবময় স্থাপত্য গড়ে তুলেছিল, কিন্তু জঘন্য মুসলিম শাসকরা সেগুলো দখল করে নাম পরিবর্তন করে নিজেদের নামে করেছিল।
ছোটবেলা থেকেই শিখেছিলাম কোন ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে আর কোনগুলো পাগলামি বলে উড়িয়ে দিতে হবে। তাই, আমি এটি বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিলাম যে, নেতাজি সুভাষ বসু বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাননি অথবা লি হার্ভে অসওয়াল্ড একা কাজ করেননি (আমি এখনো ওটা বিশ্বাস করি)। কিন্তু আমি ওই তত্ত্বগুলোর সঙ্গে সেই তত্ত্বের পার্থক্য করতাম, যেটি বলত শেকসপিয়ার আসলে ‘শেখ পীর’ নামে একজন ভারতীয় ছিলেন, কিংবা আমার সংস্কৃত শিক্ষিকা শাস্ত্রীজির মতামতের, যিনি আমাদের বলতেন, প্রাচীন ভারতীয়রাই উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেছিল, কিন্তু পশ্চিমারা ভারতীয় সভ্যতাকে এর কৃতিত্ব দেয়নি।
আরো পরে আমি মার্কিন মহাকাশযান অ্যাপোলো ১১-এর নভোচারী বাজ অলড্রিনের ইসলাম গ্রহণ করার পর ধর্ম প্রচারে নেমেছেন—এই দাবি হেসে উড়িয়ে দিতে পেরেছিলাম। তার মুসলমান হওয়ার গল্প গল্পটা এ রকম—অলড্রিন চাঁদে অবতরণ করার সময় একটি শব্দ শুনতে পান। পৃথিবীতে ফিরে আসার পর তিনি জানতে পারেন, চাঁদের সেই শব্দটা ছিল আসলে আজানের শব্দ। আর এভাবেই তিনি মুসলমান হয়ে ইসলাম ধর্ম প্রচারে নামেন। (পরে অলড্রিনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে এবং তার চন্দ্রাভিযান নিয়ে আলোচনা করেছি। তিনি ধর্মান্তরিত হননি) অলড্রিন আরো একটি তত্ত্বের বিষয়বস্তু হয়েছিলেন যখন অভিযোগ ওঠে, তিনি এবং নীল আর্মস্ট্রং হলিউডের একটি স্টুডিওতে চন্দ্রাভিযানের ঘটনা সাজিয়েছিলেন।
কিছু প্রশ্ন তোলাই শ্রেয়
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং ইতিহাস পুনর্লিখন—এই দুয়ের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়ছে। আমাদের প্রচলিত বিশ্বাসের পরিপন্থী কোনো গভীর ঐতিহাসিক গবেষণা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমাদের মনে রাখা উচিত, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মহেঞ্জোদারো সভ্যতা আবিষ্কার ও খনন করার আগে ঐতিহাসিকদের ধারণা অনুযায়ী, ভারতীয় সভ্যতার সূচনা যে সময়ে হয়েছিল, তারও কয়েক শতাব্দী আগে মহেঞ্জোদারোর যাত্রা শুরু হয়েছিল। অথচ এ সম্পর্কে আগে আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না আগে।
মুরলি মনোহর জোশি বিজেপি সরকারের মন্ত্রী থাকার সময় বারবার দাবি করেছিলেন, হরপ্পা সভ্যতা সিন্ধু নদের তীরে নয়, বরং সরস্বতী নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল। তার এই দাবিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। তাছাড়া হরপ্পা সংস্কৃতি নিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন আছে, যার উত্তর আজও মেলেনি। হরপ্পাবাসী কারা ছিলেন? তারা কি বর্তমান দ্রাবিড়দের পূর্বপুরুষ? তাদের কি কোনো সুনির্দিষ্ট ধর্ম ছিল? কেন আমরা আজও তাদের ভাষার রহস্য উন্মোচন করতে পারলাম না?
অযৌক্তিক ধারণার মূলধারায় উঠে আসা
সমস্যা হলো, গভীর গবেষণায় নিয়োজিত ঐতিহাসিকদের যে ক্ষেত্র, সেখানে এখন ধর্মান্ধতা ও রাজনীতি অনুপ্রবেশ করেছে। কোনো জোরালো প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থি গোষ্ঠী হরপ্পার অধিবাসীদের হিন্দু হিসেবে দাবি করতে বদ্ধপরিকর। হিন্দুত্ববাদী শিবিরের আশঙ্কা, যদি এটা প্রমাণ হয় যে, এই মানুষগুলো অন্য কোনো ধর্ম পালন করত, তবে হিন্দুধর্ম ভারতের আদি ধর্ম হিসেবে গণ্য হবে না। এর অর্থ দাঁড়াবে, হিন্দুধর্ম-পরবর্তী সময়ে সম্ভবত কোনো জনসমষ্টির অভিবাসনের মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করেছিল।
এখানে বলা প্রয়োজন, খ্রিষ্টধর্ম ভারতের কেরালায় পৌঁছানোর অনেক পরে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল। কোন ধর্ম কখন উদ্ভূত হয়েছিল, তা জানাটা খুব জরুরি কোনো বিষয় নয়। রোম কখন খ্রিষ্টানদের শহরে পরিণত হয়েছিল, তা নিয়ে বিতর্কে পোপের মর্যাদার কোনো হেরফের হয় না।
কিন্তু হিন্দুত্ববাদীদের প্রধান যুক্তি হলো—মুসলিমরা বহিরাগত। তারা বাইরে থেকে ভারতে এসেছিল এবং এদেশের মানুষকে ধর্মান্তরিত করেছিল। তাই সমস্যাটা তখনই তৈরি হয়, যখন দেখা যায় যে, হিন্দুধর্ম ছড়িয়ে পড়ার আগেই ভারতে এক উন্নত অ-হিন্দু সভ্যতা বিদ্যমান ছিল, হয়তো এমন কোনো সভ্যতা, যা গড়ে উঠেছিল অন্য কোনো অঞ্চল থেকে আসা হিন্দুদের হাত ধরেই, যারা তাদের ধর্মবিশ্বাস সঙ্গে করে এনেছিল। বিচক্ষণ মানুষের কাছে এই পার্থক্যটি হয়তো অর্থহীন বা বোকামিপূর্ণ মনে হতে পারে। কারণ আমরা সবাই এখন ভারতীয় এবং এক বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের নাগরিক। কিন্তু আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে, মুসলিমরা শুধুই একদল নৃশংস আক্রমণকারী, যারা ভারতে এসে আমাদের স্মৃতিস্তম্ভগুলো দখল করেছিল, তখন স্বাভাবিকভাবেই এই পার্থক্যটি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আর ঠিক এ কারণেই উদ্ভট ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক প্রশ্নগুলোর মধ্যকার সীমারেখাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট করে ফেলা হয়েছে।
হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থিদের বারবার এটি প্রমাণ করতে হয়, মুসলিম আক্রমণকারীদের কারণে ভারতের হিন্দুদের কতটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল। তাদের বারবার জোর দিয়ে বলতে হয়, ভারতীয় সংস্কৃতিতে মুসলিমদের কোনো বড় অবদান নেই, বরং তাদের প্রতিটি অর্জনই ছিল হিন্দু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি চুরির ফসল।
আবার বলছি, এগুলো নতুন কোনো কথা নয়। সবসময়ই এমন এক উগ্র গোষ্ঠী ছিল, যারা এই মতবাদে বিশ্বাসী। তবে, পার্থক্যটা হলো তারা এখন আর প্রান্তিক কোনো গোষ্ঠী নয়। বরং তারা এখন মূলধারার রাজনীতির বিপজ্জনক কাছাকাছি চলে এসেছে। গোঁড়ামি ও অন্ধবিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে ইতিহাসকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। তাই উদ্ভট ও চরমপন্থি মতবাদগুলোর যে মর্যাদা প্রাপ্য নয়, তা তাদের না দেওয়া এবং ঘৃণার কাছে সত্যকে হারিয়ে যেতে না দেওয়া এখন খুবই জরুরি।
কোনো মিথ্যা বারবার বলা হলে তা সত্য বলে মনে হতে থাকে। যে সমাজ বর্তমানের রাজনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে অতীতকে বিকৃত ও অবমূল্যায়ন করে, তা নিজের এবং সেখানে বসবাসকারী সবারই ক্ষতি করে। কাজেই পাগলদের হাতে মানসিক হাসপাতাল পরিচালনার ভার ছেড়ে দেওয়াটা কখনোই ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
দ্য প্রিন্ট অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

