জুলাই ব্যর্থ কি না—এই প্রশ্নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে জুলাইকে কারা কেন ব্যর্থ দেখাতে চায়? এই মনস্তত্ত্বের পেছনে রাজনীতিটা কী?
ওপরের এ দুটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে ছোট করে দেখে নিই জুলাই আসলেই ব্যর্থ হয়েছে কি না।
জুলাই অভ্যুত্থান অনেকটা ঘূর্ণিঝড়ের মতো। একটা ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হওয়ার মতো অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ারও তিনটি ধাপ থাকে। অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার আগে, জনপদে রাজনৈতিক বৈরী অবস্থা ঠিক যেমন ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হওয়ার জন্য আবহাওয়ার একটা পূর্ববর্তী বৈরী অবস্থা থাকে, সে রকম।
অভ্যুত্থানকালে যেমন ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হওয়ার সময় সবকিছু লন্ডভন্ড করে উপড়ে ফেলে চলে যায়। কতখানি শক্তিতে ঘূর্ণিঝড় জনপদ আঘাত করবে, সেটি নির্ভর করে বৈরী বাতাসের বেগের ওপর। অভ্যুত্থানো তাই কত জোরে আঘাত করবে, এর কোনো হিসাব-কিতাব থাকে না।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়। ঝড়-পরবর্তী সময় যেমন একটা জনপদের বিধ্বস্ত অবস্থা হয়, অভ্যুত্থানও একইভাবে রেখে যায় জনপদকে। সেজন্য অভ্যুত্থান-পরবর্তী একটা সুবর্ণ সুযোগের তৈরি হয় নতুন করে ওই জনপদের সবকিছুকে বিনির্মাণের। অভ্যুত্থান-পরবর্তী জনপদে কাঙ্ক্ষিত বিনির্মাণটি করা গেল কী গেল না, তার ওপরে আসলে অভ্যুত্থান সফল হয়েছে কী হয়নি, সেই প্রশ্নের উত্তরটা নির্ভর করে না। কারণ অভ্যুত্থানে নিজেই একটা সফলতা। সুনির্দিষ্ট করে বললে জুলাই অভ্যুত্থানে হাসিনা শাহির পতন এবং আওয়ামী লীগের দুঃশাসনমুক্ত বাংলাদেশই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, সবচেয়ে বড় সফলতা। আমরা এখন অভ্যুত্থান-পরবর্তী অধ্যায়, তার মানে তৃতীয় অধ্যায়ে আছি। এখানে সম্মিলিত চেষ্টা আমরা সফল হতে পারি আবার সবাই মিলে একসঙ্গে ব্যর্থও হতে পারি। তাতে ঘটে যাওয়া অভ্যুত্থানের কিছু যায় আসে না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—তারপরও জুলাই অভ্যুত্থানকে আসলে সুনির্দিষ্টভাবে কারা এবং কেন ব্যর্থ হিসেবে হাজির করতে চায়?
যেকোনো রাজনৈতিক মতের পেছনে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, সুনির্দিষ্ট ওই রাজনৈতিক মতটি তৈরি করছে, সেটি চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ রাজনৈতিক মত তৈরি করা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কখনোই তার রাজনৈতিক চিন্তা নিরপেক্ষ সত্তা না। এখানে দুটো প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ। বয়ান হাজিরকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় কী এবং যে রাজনৈতিক বয়ানটি ময়দানে হাজির করছে, সেই হাজির করার পেছনে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ত কী?
স্বভাবতই জুলাইকে যারা মহিমান্বিত করে দেখে আর জুলাইকে যারা ব্যর্থ হিসেবে দেখে, এই দুটি গ্রুপ কখনোই এক না। জুলাইকে ব্যর্থ হিসেবে হাজির করা হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানকে অবমাননা বা ডিফেম করার প্রকল্পেরই একটা অংশ।
যেমন রুমিন ফারহানা যখন বলেন, ‘ডানপন্থার উত্থান হবে জানলে আমরা অনেকেই অভ্যুত্থানে অংশ নিতাম না’ কিংবা ‘আমিও তো অভ্যুত্থানে ছিলাম কিন্তু এমন বাংলাদেশ কি চেয়েছিলাম?’ অথবা শিক্ষক ফাহমিদুল হক যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ইন্টারভিউতে বলেন, ‘যে কারণে জুলাই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলো’ এসবই একই ডিফেম মনস্তত্ত্বের ঘেরাটপ। সচেতনে অথবা অবচেতনে।
মানে ওনারা বলতে চান যেহেতু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমাদের বহু লোকের বহু ধরনের প্রত্যাশা, প্রাপ্তি পূরণ হয়নি অথবা হচ্ছে না, কাজেই জুলাই অভ্যুত্থান ব্যর্থ। এখন আপনি যদি একটু মনে করে দেখেন পার্থ বড়ুয়া যখন বিভ্রান্তের মতো রাস্তায় হাঁটছে আর বলছে—‘ছোট বাচ্চাগুলারে মেরে ফেলতেছে, রাতে ঘুমাইতে পারি না। এটি হচ্ছে ওয়ান অব দ্য মোস্ট অথেন্টিক ফিলিং, যে কারণে হাজারে হাজারে বাবা-মা রাস্তায় নেমেছিলেন।’ গন মানুষের মধ্যে একটাই চিন্তা ছিল— ‘আমাদের বাচ্চাদের মেরে ফেলতেছে, এই সরকারকে আর ক্ষমতায় রাখা যাবে না।’ সেই চিন্তার জায়গা থেকে জুলাই অভ্যুত্থান যে শুধু সফল, তা-ই নয়, ব্যাপকভাবে সফল। মাত্র ২১ দিনে হাসিনার মতো একটা নিষ্ঠুর জালিম সরকারকে ধাক্কা মেরে শুধু ক্ষমতা থেকেই ফেলেনি, দেশছাড়া করেছে।
এখন তারপরও যারা বলে জুলাই ব্যর্থ, তারা আসলে রাজনৈতিক মহলে কোন বর্গে পড়ে?
মোটা দাগে এখানে তিন ধরনের রাজনৈতিক সত্তা আছে। একদল হচ্ছে সরাসরি মুজিববাদী রাজনীতিতে বিশ্বাস করা আবেগ ধারণ করা। জুলাইকে ব্যর্থ দেখাতে না পারলে বা বলতে না পারলে আওয়ামী লীগের শাসন সম্পূর্ণ বৈধতা হারায়। রাজনৈতিকভাবেই তো তারা এটি হতে দেবে না। বিষয়টি হয়ে গেছে পুরোটাই মুদ্রার এপিঠ নয় ওপিঠ। আপনাকে যদি আওয়ামী লীগের শাসনব্যবস্থাকে লেজিটেমেট দেখাতে হয়, তাহলে জুলাইকে ব্যর্থ বলতে হবে। এটি হলো একটা দল।
দ্বিতীয় দলের মনস্তত্ত্ব অনেক সূক্ষ্ম। এদের অনেকেই প্রকারান্তরে অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর অনেক অবাস্তব স্বপ্ন বা বাংলাদেশে বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাস্তবসম্মত নয়, এ ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রত্যাশা করেছেন এবং সেই প্রত্যাশার আলোকে জুলাইয়ের প্রাপ্তি বিচার করে তার কাছে মনে হচ্ছে জুলাই ব্যর্থ।
তৃতীয় দলটার মনস্তত্ত্ব সূক্ষ্মতর। এটি প্রধানত আরবান সেকুলার বর্গ। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক লিটারেচার ইন্টেলেকচুয়ালি এরা ডমিনেট করে বড় মাত্রায়। জুলাই অভ্যুত্থান যে বিপ্লবের বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছিল, রাষ্ট্রের খোলনলচা পাল্টে দেওয়ার যে সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছিল, সে রকমের একটা অভ্যুত্থানের স্বপ্ন এরা দেখত। যে কারণে দেখবেন এরা এখনো স্লোগান দেয়, ‘এই রাষ্ট্র পচা-গলা, এই রাষ্ট্র ভাঙতে হবে’, ‘এই রাষ্ট্র ভাত দেয় না, এই রাষ্ট্র ভাঙতে হবে’।
অর্থাৎ রাষ্ট্র ভাঙার আকাঙ্ক্ষা বা রাষ্ট্র পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা সবচেয়ে বেশি এদেরই ছিল, এদেরই আছে। কিন্তু মুশকিলটা অন্য জায়গায়। এরা আরো স্লোগান দেয়—‘বিপ্লবের লাল পতাকা আমরাই ওড়াব।’
মানে বিপ্লবের লাল পতাকা ওনাদের নেতৃত্ব ছাড়া বা এই বর্গটা ছাড়া অন্য কেউ ওড়ানোর এলেম রাখে না বা ওড়াতে পারবে না। এ বিপ্লবে লাল পতাকা শুধু ওনারাই ওড়াবে। এখানেই হয়ে গেছে মূল বিপত্তিটা। এই অভ্যুত্থান শুধু আরবান সেকুলার বর্গের অংশগ্রহণে হয়নি বা ওনাদের নেতৃত্বেও হয়নি। লাখ লাখ মানুষের ভিড়ে ওনারাও ছিলেন সাধারণ অংশগ্রহণকারী। তাই তারা এই অভ্যুত্থানকে নিয়ে পুরোপুরি গর্ব করতে পারে না। এরা যেহেতু নেতৃত্বে ছিল না, কাজেই এটি সফল অভ্যুত্থান না। এটি ব্যর্থ। বিষয়টি কি এমন—ওনারা যদি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেলতে পারত, তাহলে পরে বিপ্লবী রাষ্ট্র নির্মাণ করে ফেলত? এই শেষ লাইনটা আমার কানে যেমন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে, আপনাদের কারো অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে না?
খেয়াল করে দেখেন, ৯০-কে কত মহান হিসেবে হাজির করা হয় এবং ৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলন নিয়ে কোনো ধরনের কোনো সমালোচনা পাবেন না। কেন? কারণ বিষয়টা কি এমন—৯০ আমরা যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এরশাদ স্বৈরাচারকে হটিয়েছিলাম, তার সব কিছু অর্জন করে ফেলতে পেরেছিলাম? অথবা ৯০-পরবর্তী বাংলাদেশে একটা সুজলা-সুফলা মণ্ডিত বাংলাদেশে পরিণত হয়েছিল? তাহলে ৯০ নিয়ে কোনো সমালোচনা এই মহলের নেই কেন? কারণ ৯০-এর আন্দোলনের নেতৃত্বে তারাও দৃশ্যমান ছিলেন। সে কারণে ৯০ বিতর্ক ছাড়া মহান, মহিমান্বিত।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং তার সামনের সারির নেতাদের ব্যর্থ প্রমাণ করার আরেকটা কারণ হচ্ছে, অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা একটা রাজনৈতিক দল। আমার বিশ্বাস, অভ্যুত্থান থেকে যদি রাজনৈতিক দলটা তৈরি না হতো, তাহলে জুলাই অভ্যুত্থানকে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যদের এই পরিমাণে ব্যর্থ হিসেবে দেখানোর তাগিদটা থাকত না।
অথচ যেকোনো অভ্যুত্থানের সফলতা মাপার অন্যতম ইন্ডিকেটর কিন্তু অভ্যুত্থানপন্থি রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দল এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে কি না, সেটি। সেই অর্থে অভ্যুত্থানপন্থি একটা রাজনৈতিক দল কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সফলতার নজির।
বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান যেকোনো মাণদন্ডে সবচেয়ে সফলতম গণআন্দোলন।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




