দক্ষ নার্স তৈরির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় শুরু হয়েছিল আধুনিক নার্সিং কলেজ নির্মাণ প্রকল্প। কিন্তু প্রায় ৩২ কোটি টাকার এই প্রকল্প এখন অব্যবস্থাপনা, দীর্ঘসূত্রতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে আলোচনায়।
প্রকল্পের ৮৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখিয়ে প্রায় ২৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে প্রায় দুই বছরেও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। দীর্ঘদিন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় নির্মাণাধীন ভবনটি এখন মাদকসেবী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (এইচইডি) সূত্রে জানা গেছে, শিবচর উপজেলার বড় বাহাদুরপুর ও বড় দোয়ালী মৌজায় ২০২১ সালের ১০ মার্চ নার্সিং কলেজের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৩২ কোটি ১২ লাখ টাকা (কিছু দাপ্তরিক নথিতে ৩৩ কোটি ২৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা উল্লেখ রয়েছে)।
চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। রাজধানীর মিরপুরের পূর্ব শেওড়াপাড়াভিত্তিক মেসার্স এমএনএইচসিএল ও এইচএমএইচই (জেভি) নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে নির্মাণকাজের দায়িত্ব পালন করছিল।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করে প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্প ছেড়ে চলে যায়।
এর আগেই নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৮৮ শতাংশ দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। পরে কাজ সম্পন্নে ব্যর্থ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল ও কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন কলেজের পুরো ক্যাম্পাস আগাছা, ঘাস ও লতাপাতায় ছেয়ে গেছে। ভবনের বিভিন্ন কক্ষে পড়ে রয়েছে মাদক সেবনের নানা উপকরণ। চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে আছে। ভবনে নেই কোনো নিরাপত্তাকর্মী কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
দীর্ঘদিন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় বিভিন্ন কক্ষ থেকে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, দরজা-জানালা এবং মূল্যবান নির্মাণসামগ্রী চুরির ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর ভবনটির আশপাশে সাধারণ মানুষের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। নির্জন পরিবেশের সুযোগে সেখানে নিয়মিত মাদকসেবীদের আড্ডা ও বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন মিয়া বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই এখানে আর কোনো কাজ হচ্ছে না। নিরাপত্তা না থাকায় ভবনটি এখন মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।
আরেক বাসিন্দা সাব্বির হোসেন বলেন, দিনের বেলায়ও জায়গাটি অনেকটা নির্জন থাকে। সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ এখানে চলাচল করতে ভয় পান। দ্রুত কাজ শেষ করে কলেজটি চালু করা প্রয়োজন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য জহির হোসেন পাপ্পু বেপারী বলেন, এলাকার মানুষ অনেক আশা নিয়ে কলেজটির অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু এখন এটি সরকারি সম্পদের অপচয়ের একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত নির্মাণ শেষ করে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা জরুরি।
কৃষিবিদ শাহীন শিকদার মিয়া বলেন, এত বড় বিনিয়োগের প্রকল্প দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) শিবচর উপজেলা শাখার সভাপতি আবুল খায়ের খান বলেন, দেশে দক্ষ নার্সের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এই কলেজ দ্রুত চালু করা গেলে দক্ষ জনবল তৈরি হবে এবং স্বাস্থ্যসেবার মানও উন্নত হবে। তাই প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে মাদারীপুর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ আহসান হাবীব বলেন, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আগের দরপত্র বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে। দ্রুত অবশিষ্ট কাজ শেষ করে ভবনটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন যেখানে ৮৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখিয়ে প্রায় ২৮ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে, সেখানে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি এবং নির্মাণকাজের তদারকি কীভাবে করা হয়েছিল? অরক্ষিত অবস্থায় সরকারি সম্পদের ক্ষতি ও চুরির দায়ভার কার এ প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর চান তারা।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে অবশিষ্ট নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন করে বহু প্রতীক্ষিত নার্সিং কলেজটি চালুর মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতের গুরুত্বপূর্ণ এই বিনিয়োগকে কার্যকর করা হোক।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

