কমেছে অর্ডার ও গড় মূল্য

ইইউতে পোশাক রপ্তানিতে চাপের মুখে বাংলাদেশ

ইইউতে পোশাক রপ্তানিতে চাপের মুখে বাংলাদেশ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরো দুর্বল হয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে এই বাজারে চলতি বছরের প্রথম দিক থেকেই বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে এই বাজারে শীর্ষ ১০ পোশাক সরবরাহকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে সবচেয়ে বেশি। শুধু বৈশ্বিক চাহিদা কমার প্রভাবই নয়, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অর্ডার এবং গড় রপ্তানি মূল্য—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পিছিয়ে পড়েছে দেশের পোশাক খাত। ফলে প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে বলে উঠে এসেছে ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে বিশ্ববাজার থেকে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে ৩৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। এক বছর আগে এ অঙ্ক ছিল ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ইউরো। এই সংকোচনের পেছনে আমদানির পরিমাণ ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ কমে যাওয়া এবং গড় ইউনিট মূল্য ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ হ্রাস পাওয়া সমানভাবে ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ, ইউরোপে দুর্বল ভোক্তা চাহিদার পাশাপাশি মূল্যহ্রাসও বাজারকে চাপে রেখেছে।

বিজ্ঞাপন

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মে পর্যন্ত ইইউতে দেশের পোশাক রপ্তানি ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমে ৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ কমেছে। বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় উভয় সূচকেই বাংলাদেশের পতন প্রায় দ্বিগুণ।

শুধু মে মাসের হিসাবেও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। ওই মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি রপ্তানির পরিমাণ ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং গড় মূল্য ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর পারফরম্যান্স ছিল ভিন্নধর্মী। চীনের রপ্তানি মূল্য মাত্র ৪ দশমিক ২০ শতাংশ কমেছে। বরং একমাত্র দেশ হিসেবে তাদের রপ্তানির পরিমাণ ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেড়েছে। বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে দেশটি মূল্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে।

ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটির রপ্তানি মূল্য মাত্র ১ দশমিক ৫১ শতাংশ কমেছে। যদিও চালানের পরিমাণ ১২ দশমিক ২৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, তবে গড় ইউনিট মূল্য ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়েছে। ফলে উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে আয়ের বড় অংশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে দেশটি।

তুরস্ক ও কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে রপ্তানির পরিমাণ যথাক্রমে ১৭ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ১৫ দশমিক ১৩ শতাংশ কমলেও গড় মূল্য বেড়েছে। পাকিস্তানের রপ্তানি আয় ১৭ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে, যদিও রপ্তানির পরিমাণ ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে পুরো চাপ এসেছে দামের ওপর, কারণ দেশটির গড় ইউনিট মূল্য ১৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমেছে। ভারতের রপ্তানি ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমেছে, যা বাংলাদেশের তুলনায় কম হলেও একই ধরনের প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি, ২৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ কমেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে একই সঙ্গে রপ্তানির পরিমাণ এবং গড় মূল্য—উভয় ক্ষেত্রেই বড় অবনতি দেখা যাচ্ছে। ভিয়েতনাম যেখানে উচ্চমূল্যের পণ্যের মাধ্যমে আয় ধরে রেখেছে এবং চীন মূল্য সমন্বয় করে অর্ডার বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়েছে।

এপ্রিল মাসে শুরু হওয়া এই প্রবণতা মে মাসেও অব্যাহত থাকায় এটিকে সাময়িক নয়, বরং দেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, পণ্যের বৈচিত্র্য, মূল্য সংযোজন এবং বাজার কৌশল নিয়ে গভীর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে ইইউ থেকে, তাই এই বাজারে এমন পতন দীর্ঘস্থায়ী হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দ্রুত উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ইউরোপের বৃহত্তম রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন