একটি স্লোগান কিংবা বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড কীভাবে অবদমিত ক্ষোভকে শানিত করে বিশ্ব কাঁপানো গণঅভ্যুত্থানে রূপ দিতে পারে, তার দৃষ্টান্ত মানবসভ্যতায় রয়েছে বহু। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে যেমন ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগানটি একটি ফুলকি হিসেবে কাজ করেছিল। আবার তা স্ফুলিঙ্গ হয়ে গণবিস্ফোরণে রূপ নেয় দুহাত প্রসারিত করে উদ্যত বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে আবু সাঈদের আত্মদান। চব্বিশের ১৬ জুলাই একদিনে আবু সাঈদ ও ওয়াসিমসহ ছয় শহীদের আত্মদান কোটাবিরোধ আন্দোলন থেকে ফ্যাসিবাদী শাসক হটানোর অভূতপূর্ব বিপ্লবের সূচনার অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এই প্রেক্ষাপটে আজকের দিনটি সরকারিভাবে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে।
২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিউনিসিয়ার সিদি বাউজিদ শহরে তারেক আল-তায়েব মোহামেদ বুয়াজিজি নামের ২৬ বছর বয়সি ফল বিক্রেতার ফল বিক্রির ঠেলাগাড়িটি পুলিশ বেআইনি দাবি করে কেড়ে নেয় এবং তাকে অপমান করে। ক্ষোভে ও অপমানে বুয়াজিজি স্থানীয় পৌরসভা কার্যালয়ের সামনে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মাহুতি দেন। এই একটি ঘটনা তিউনিসিয়ার সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, দুর্নীতি ও বাকস্বাধীনতাহীনতার ক্ষোভকে রাস্তায় নামিয়ে আনে। স্লোগান ওঠে স্বৈরশাসক জিনে আল-আবেদিন বেন আলির পতনের। আন্দোলনের মাত্র চার সপ্তাহের মাথায় ২৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বেন আলি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ‘আরব বসন্ত’ নামের বিশাল গণআন্দোলনের জন্ম দেয়।
আবার দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সরকার কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেয় যে, তাদের স্কুলের অর্ধেক পড়াশোনা আফ্রিকান্স ভাষায় করতে হবে। এর প্রতিবাদে ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন সোয়েটো শহরের হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থী শান্তিপূর্ণ মিছিল বের করে। পুলিশ নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালায়, যাতে ১২ বছর বয়সি হেক্টর পিটারসনসহ বহু শিক্ষার্থী নিহত হয়। হেক্টরের রক্তাক্ত লাশ কোলে নিয়ে এক যুবকের দৌড়ানোর ছবি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এই নৃশংসতা কৃষ্ণাঙ্গদের মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। সোয়েটোর এই বিদ্রোহই দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয় এবং নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দেয়।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনের গতি-প্রকৃতির সঙ্গে বিশ্বব্যাপী এই আন্দোলনগুলোর দারুণ মিল রয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে—জনগণের ভেতর ক্ষোভ, বৈষম্য আর দমন-পীড়নের বারুদ আগে থেকেই জমা হচ্ছিল। শুধু প্রয়োজন ছিল একটি নির্দিষ্ট স্ফুলিঙ্গের—তা হোক তিউনিসিয়ার বুয়াজিজির আত্মাহুতি, ইউক্রেনের একটি ফেসবুক পোস্ট, কিংবা বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের আবেগে আঘাত করা একটি বৈষম্যমূলক ‘রাজাকার ট্যাগ’। আর সেই ট্যাগিংয়ের প্রতিবাদে দাঁড়ানো সাহসের প্রতীক আবু সাঈদ বা ওয়াসিমদের গুলি করে হত্যার ঘটনাই স্ফুলিঙ্গ হয়ে জ্বলে উঠেছে। সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ দাবানলের মতো পুরো ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থাকে তাসের ঘরের মতো তছনছ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দিনটি সোনালি হরফে লেখা বিশেষ দিনে পরিণত হয়েছে। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাহসী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ দানব সরকারের অস্ত্রের সামনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জীবনকে তুচ্ছ করে দুই হাত প্রশস্ত করে দাঁড়িয়ে বিশ্ববাসীকে তারুণ্যের দুরন্ত সাহস দেখিয়ে দিয়েছেন। বিশ্ব ইতিহাসেও আবু সাঈদ অনন্য চরিত্র হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন। পুলিশের কয়েকজন সদস্য একসঙ্গে তাকে ঘিরে ধরে লাঠিপেটা করেছে। অকুতোভয় আবু সাঈদ এত মার খাওয়ার পরও অস্ত্রের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়াতে দ্বিধা করেননি। আবু সাঈদকে খুব কাছে থেকে নির্মমভাবে ছররা গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এরপরও জীবনের এমন এক উচ্চতায় আবু সাঈদ পৌঁছে গেছেন, যেখানে পৌঁছে গেলে মানুষ অমরত্ব লাভ করে। শহীদ আবু সাঈদ জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেছেন, মৃত্যুও কত সুন্দর হতে পারে, অর্থবহ হতে পারে। ১৬ জুলাইয়ের পরের দিনগুলোতে দেশজুড়ে আন্দোলনকারীরা যেন আবু সাঈদের মতো হয়ে উঠেছিল। তারাও মৃত্যুভয় পদদলিত করে এগিয়ে গেছে আগ্রাসী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে। চৌদ্দশ ছাত্র-জনতা তপ্ত বুলেটের সামনে বুক পেতে অকাতরে জীবন দিয়েছে। তারই পরিণতিতে ৫ আগস্ট দানবীয় সরকারের পতন ও পলায়নের সাক্ষী হয়েছে বিশ্ব।
জুলাই শহীদ দিবস
অবিস্মরণীয় সেই ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে আজ শোক পালন করা হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে ১৬ জুলাইকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে পালনের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার দিনটি পালন উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যাপক কর্মসূচি নিয়েছে। জুলাইবিপ্লবের পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন দিনটি পালন করবে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে। দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি-বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। শহীদদের মাগফিরাতের জন্য দেশের সব মসজিদে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শহীদদের আত্মার শান্তির জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।
দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম-খুন, ভোটাধিকার হরণ এবং নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আপামর জনগণের ক্ষোভের বিস্ফোরণ।
এছাড়া গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ৫ আগস্টকে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ ঘোষণা করে। ওইদিন সাধারণ ছুটি থাকবে।
কোটা সংস্কারের দাবিতে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ১৪ জুলাই পর্যন্ত শান্তিপূর্ণই ছিল। কোনো ধরনের সহিংসতা ছাড়াই আন্দোলন চলে এলেও ১৫ জুলাই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর বেপরোয়া হামলা চালায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ। এ ঘটনায় সারা দেশের শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পুরো দেশ। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ছাত্র-বিক্ষোভে পুলিশ ও ছাত্রলীগের বাধায় সহিংস এবং রক্তক্ষয়ী হয়ে ওঠে। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে নামে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও। পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, হামলা, গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ আর অগ্নিসংযোগে উত্তেজনা বিরাজ করে দেশব্যাপী।
সেদিন সারা দেশে বিক্ষোভ-সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকা, রংপুরসহ দেশের পাঁচ বিভাগে এদিন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। টালমাটাল পরিস্থিতিতে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
যেভাবে বারুদ শহীদ আবু সাঈদ
বেরোবির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ কোটা আন্দোলনের বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন। আবু সাঈদ যেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন তার পাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, আবু সাঈদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ চলছিল। পুলিশি হামলায় সেই বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে আবু সাঈদ সেখানে দাঁড়িয়ে সবাইকে আবার সংগঠিত করার চেষ্টা করছিলেন। এক সময় একদল আগ্রাসী পুলিশ আবু সাঈদকে ঘিরে ধরে নির্দয়ভাবে পেটাতে থাকে। তবুও তিনি সরে যাননি। পিটুনির তিন-চার মিনিটের মধ্যে আবু সাঈদ দু’হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে যান। অবিশ্বাস্যভাবে দানব পুলিশ সদস্যরা তার দিকে বন্দুক তাক করে সরাসরি গুলি ছুড়তে থাকে। আবু সাঈদ ও পুলিশের মধ্যে দূরত্ব ছিল মাত্র ৩৫-৩৮ ফুট। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও থামেননি অদম্য সাহসী এই বীরযোদ্ধা। একটা ঝাঁকুনি খেয়ে রাস্তার ডিভাইডার অতিক্রম করেন আবু সাঈদ। রক্তক্ষরণে আস্তে আস্তে পিচঢালা রাজপথে লুটিয়ে পড়েন। কয়েকজন সংবাদকর্মী হাত-পা ধরে চ্যাংদোলা করে তাকে সরিয়ে নেন।
আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হন দুপুর ২টা ১৭ মিনিটে। দ্রুত তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক ৩টা ৫ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সহযোদ্ধারা তার লাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু পারেননি। কিছুদূর নিলে পুলিশ লাশ কেড়ে নেয়। তারপর চলে লাশ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর টানা ৯ ঘণ্টা লাশ হাসপাতালে কোনো কারণ ছাড়াই আটকে রাখা হয়। রাতেই পুলিশ তাদের তত্ত্বাবধানে লাশ দাফন করে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু তার সহযোদ্ধাদের বাধায় তা সফল হয়নি। ততক্ষণে সারা দেশে আবু সাঈদ হয়ে ওঠেন আন্দোলনের আইকনিক ফিগার। জীবিত আবু সাঈদের চেয়ে মৃত আবু সাঈদ হয়ে ওঠেন বিপুল শক্তিমান।
পুলিশ আবু সাঈদের মৃত্যুকে গুলিতে নয়, আন্দোলনকারীদের ইটের আঘাত মাথায় লেগেছে বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। চিকিৎসকের ওপর চাপ দিয়ে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পরিবর্তনেরও অপচেষ্টা হয়। গদি আঁকড়ে থাকা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা প্রথমে ওই মৃত্যুকে গুরুত্ব দেননি। আবু সাঈদের দুহাত প্রসারিত অবস্থায় গুলির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর গোটা দেশ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। সারা দেশে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে খুনি হাসিনার পদত্যাগ দাবিতে সোচ্চার হয়। তখন আবু সাঈদের পরিবারকে গণভবনে তুলে এনে নানা নাটক করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা। কোনো নাটকই পরিস্থিতি সামালে সহায়ক হয়নি।
চব্বিশের জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত অভ্যুত্থানের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপব্যবহার নিয়ে তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর)। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডে পুলিশের সরাসরি জড়িত থাকা এবং এর জন্য দায়ী হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ফরেনসিক বিশ্লেষণের পর ওএইচসিএইচআরের ফরেনসিক চিকিৎসক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, আঘাতের ধরন এবং যেভাবে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জখম হয়েছে, তাতে আবু সাঈদকে প্রায় ১৪ মিটার দূর থেকে প্রাণঘাতী ধাতব গুলিভর্তি শর্টগান দিয়ে অন্তত দুবার গুলি করা হয়েছিল। যথাযথ ময়নাতদন্তের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও নথিভুক্ত ক্ষত এবং এ সম্পর্কিত ভিডিও ফুটেজ এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে।
পীরগঞ্জের প্রত্যন্ত বাবনপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে ২০০১ সালে আবু সাঈদের জন্ম। তার বাবা মকবুল হোসেন এবং মা মনোয়ারা বেগম। নয় ভাই-বোনের অভাবের সংসারে শুধু আবু সাঈদেরই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। তিনি বেরোবির ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। ছাত্র হিসেবে ছিলেন বিনয়ী, নম্র, ভদ্র ও মেধাবী। শুধু ছাত্র হিসেবেই ভালো নয়, মানুষ হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ।
হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষে গত ৯ এপ্রিল জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায়ে দুজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া পাঁচজনকে ১০ বছর, আটজনকে পাঁচ বছর, ১১ জনকে তিন বছর কারাদণ্ড এবং একজনের হাজতবাসকে সাজার মেয়াদ হিসেবে গণ্য করা হয়। মামলার মোট আসামি ৩০ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজন হলেন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা দুজনই জেলে আছেন। যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত তিন আসামিও পুলিশের সাবেক সদস্য। তারা হলেন সাবেক সহকারী কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান, সাবেক পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ও সাবেক এসআই (নিরস্ত্র) বিভূতিভূষণ রায়। তারা সবাই পলাতক।
দশ বছরের সাজাপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি হলেন— বেরোবির সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবির গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ এবং বেরোবি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি পোমেল বড়ুয়া। এর মধ্যে ভিসি হাসিবুর গ্রেপ্তার রয়েছেন। বাকিরা পলাতক।
রাজধানীতে শহীদ দুজন
রাজধানী ঢাকার চানখাঁরপুলে এদিন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে পাঁচজন শিক্ষার্থী আহত হন। এছাড়া ইটের আঘাতে আহত হন অন্তত ২৫ জন। রাজধানীর পথে পথেও এদিন সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা ঘটে। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবে ১৬ জুলাই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভয়াবহ সংঘাতে দুজন শহীদ হন। তাদের একজনের নাম মো. সবুজ আলী, অন্যজন শাহজাহান। নিউমার্কেট এলাকায় ফুটপাতে পোশাক বিক্রি করতেন শাহজাহান। সবুজ আলীর বাড়ি নীলফামারীতে। এছাড়া পুরান ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন চার শিক্ষার্থী। প্রাণহানির পাশাপাশি শুধু ঢাকাতেই শতাধিক আহত হয়, যাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ ছিল অন্তত ২০ জন। এছাড়া ঢাকার বাইরে দুই শতাধিক আহত হয় এদিন। আহতদের মধ্যে ২৫ সাংবাদিক এবং ২০ পুলিশ সদস্যও ছিলেন।
এদিন দেশের অন্তত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। ছাত্রলীগের হামলা ও সন্ত্রাসী তাণ্ডবে কয়েকশ’ শিক্ষার্থী আহত হন। সারা দেশে আহত হন চার শতাধিক আন্দোলনকারী।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মসূচি শেষে সেদিন রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রীরা হলে ফিরে যান। অন্যদিকে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে ছাত্রলীগের সমাবেশ শেষে হলে ফেরেন সংগঠনটির নেত্রীরা। রাত ১১টার পর রোকেয়া হলের বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা হলে প্রবেশ করা ছাত্রলীগের নেত্রীদের বিতাড়িত করতে বিক্ষোভ শুরু করেন। ছাত্রীদের তোপের মুখে হল ছাত্রলীগের সভাপতি আতিকা বিনতে হোসাইনসহ ১০ নেত্রীকে রাত ১২টার পর অ্যাম্বুলেন্সে করে হল থেকে বের করে নিয়ে যায় প্রক্টরিয়াল বডি।
ছাত্রলীগ নেত্রীদের বের করে নিয়ে যাওয়ার পর ছাত্রীরা রোকেয়া হলের তৎকালীন প্রাধ্যক্ষকে ঘিরে ধরেন। তারা হাতে লেখা একটি বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করতে প্রাধ্যক্ষকে চাপ দেন। একপর্যায়ে প্রাধ্যক্ষ সেখানে স্বাক্ষর করেন। ওই বিজ্ঞপ্তিতে রোকেয়া হলকে ছাত্ররাজনীতিমুক্ত ঘোষণা করার কথা লেখা ছিল।
রোকেয়া হলের এই ঘটনা ঢাবিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হলগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একই প্রক্রিয়ায় হল থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিতাড়িত করে সেই রাতেই বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষের কাছ থেকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণার বিষয়ে লিখিত নেন ছাত্রছাত্রীরা। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আন্দোলনকারীদের এমন পদক্ষেপ ছড়িয়ে পড়ে। মূলত ১৫ জুলাই থেকেই ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অবস্থানটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। এরপর হলগুলোতে ছাত্রলীগ আর ঢোকারই সাহস পায়নি।
চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ তিনজনকে হত্যা
চট্টগ্রামের মুরাদপুরে ১৬ জুলাই বেলা সাড়ে তিনটার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডাররা। এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া হয় আন্দোলনরতদের ওপর, করা হয় ছুরিকাঘাতও। এতে তিনজন শহীদ হন। শহীদদের মধ্যে একজন ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম। তিনি চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। শহীদ অন্য দুজন হলেন চট্টগ্রাম নগরের ওমর গণি এমইএস কলেজের ছাত্র ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং পথচারী মো. ফারুক। শহীদ ফারুক কুমিল্লার একটি আসবাবের দোকানে চাকরি করতেন। ওয়াসিম হত্যাকাণ্ডের পর বন্দরনগরীতে শিক্ষার্থীদের সরকারবিরোধী আন্দোলন ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে।
কক্সবাজারের পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মুরারপাড়ার বাসিন্দা ওয়াসিম দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য ছেলে ওয়াসিমকে চট্টগ্রামে পাঠিয়েছিলেন শফিউল আলম-জোসনা বেগম দম্পতি। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আন্দোলনের সময় সেই ছেলেকে হারানোর পর দিশাহারা হয়ে পড়ে পরিবারটি। চট্টগ্রাম শহরে আন্দোলন চলাকালে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে ছুরিকাঘাতে ওয়াসিম শহীদ হন। ছেলের কবরের পাশেই বেশিরভাগ সময় কাটান বাবা। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও ছিলেন শঙ্কায়।
দুই বছর পর সেই শোক ও শঙ্কা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে ওয়াসিমের পরিবার। বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে। একমাত্র বোনের কাবিনও সম্পন্ন হয়েছে। সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আর্থিক সহায়তায় অর্থনৈতিক টানাপোড়েনও কমেছে। এখন পরিবারের অপেক্ষা ওয়াসিম হত্যার সুষ্ঠু বিচারের।
স্মৃতি স্মরণে বৈষম্যের অভিযোগ
জুলাইবিপ্লবে চট্টগ্রামে পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে শহীদ হন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম, কলেজ ছাত্র ফয়সাল ইসলাম শান্ত, দিনমজুর মো. ফারুক, কিশোর মো. সায়মন, শিক্ষার্থী তানভীর সিদ্দিকী ও হৃদয় চন্দ্র তরুয়া। তবে গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরের মধ্যেই স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে শান্ত, ফারুক, সায়মন, তানভীর ও হৃদয় চন্দ্ররা। যেকোনো আলোচনা সভা, ব্যানার কিংবা ফেস্টুনে শহীদ আবু সাঈদ ও শহীদ ওয়াসিমের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। এমনকি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ, স্থাপনা, অডিটোরিয়াম কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নামকরণেও এই দুই শহীদদের নাম অগ্রাধিকার পাচ্ছে। কিন্তু এই আন্দোলনের পটভূমিতে যারা অকাতরে জীবন সঁপে দিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই আজ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আলোচনার স্পটলাইট থেকে বহু দূরে। শহীদ পরিবারগুলো বলছে, তারা যে বৈষম্যের জন্য আন্দোলন করেছে, সেই বৈষম্য দূর তো হয়ইনি, উল্টো তাদের স্মৃতি স্মরণেও হচ্ছে বৈষম্য। অথচ একই আন্দোলনে একই দাবিতে তারা প্রাণ দিয়েছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেবল স্মৃতি রক্ষায় অবহেলা নয়, শহীদ শান্ত ও ফারুকের পরিবারকে ঠিকমতো পুনর্বাসনও করা হয়নি। নানা কষ্টে দিন পার করছেন তারা। ভালো নেই শান্তর মা কোহিনূর আক্তার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর বাড়তে থাকা বাসা ভাড়ায় তাদের জীবন এখন হাঁপিয়ে উঠেছে। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, চিকিৎসাব্যয় যোগাড় করার লড়াই এখন তাদের কাছে বড় যুদ্ধ। জেলা প্রশাসক ও সিএমপি কর্মকর্তাদের কাছে বারবার ধর্না দিয়েও একটি বিনা ভাড়ার বাসা কপালে জুটেনি শহীদ ফয়সাল ইসলাম শান্তর পরিবারের। উল্টো জুটেছে ‘নানা দিক থেকে নানা কিছু পাচ্ছেন’ এমন ভর্ৎসনা। আর শহীদ ফারুকের স্ত্রী দুই সন্তান নিয়ে আছেন ভরণপোষণের কষ্টে। অস্থায়ীভাবে পুলিশ হাসপাতালে আয়ার চাকরি জুটলেও তাকে স্থায়ী করা হয়নি এখনো।
শহীদ শান্তর বাড়ি বরিশালে হলেও তারা থাকেন নগরের লালখান বাজারে ভাড়া বাসায়। তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন। একমাত্র বোন সুমাইয়া জান্নাত বৃষ্টি দশম শ্রেণিতে পড়ে। স্কুলশিক্ষিকা মা মোছাম্মৎ কোহিনূর আক্তারের সামান্য বেতনে চলছে সংসার। বাসা ভাড়া, মেয়ের টিউশন ফি, অসুস্থতার খরচ সবই চলছে তার আয়ে। দুই বছর ধরে নানা আশ্বাস পেলেও শান্তর বাবার কপালেও জুটেনি কোনো ভালো চাকরি। লোকসানে ব্যবসা হারানোর পর থেকে তিনি বেকার।
শান্ত ছিলেন এমইএস কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগরী দক্ষিণের সাথী এবং স্কুল পশ্চিম ওয়ার্ড শাখার সভাপতি ছিলেন। আর মো. ফারুক ছিলেন একটি ফার্নিচার দোকানের মিস্ত্রি। ১৬ জুলাই বিকেলে কোটাবিরোধী আন্দোলনে পুলিশ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে তারা গুলিবিদ্ধ হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাদের মৃত্যু হয়।
সারা দেশে যা ঘটেছিল
১৬ জুলাই রাজধানী ছাড়াও অন্তত পাঁচ জেলায় মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। দিনব্যাপী বিক্ষোভে ব্যাপক সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম, সিলেট, বগুড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বান্দরবান, রাঙামাটি, দিনাজপুর, ঝিনাইদহ, বরিশাল, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুরসহ অন্তত ১৫ জেলায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। কোথাও কোথাও তাদের সঙ্গে যুবলীগের নেতাকর্মী ও পুলিশও যোগ দেয়।
সহিংসতায় অনেক স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। বগুড়ার সাতমাথায় প্রধান ডাকঘর, মুজিব মঞ্চ ও শেখ মুজিবের ম্যুরাল ভাঙচুর করেন আন্দোলনকারীরা। একই সঙ্গে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পে অগ্নিসংযোগ, জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় এবং আওয়ামী লীগ নেতার ব্যক্তিগত অফিসেও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ সময় অন্তত আটটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু হলেও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বিকেলে বিক্ষোভকারীরা হলের ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর করেন। একপর্যায়ে সেখানে থাকা বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
দিনভর সংঘর্ষের পর ১৬ জুলাই রাতে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফেসবুক পেজ ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পরদিন ১৭ জুলাই বেলা দুটায় ঢাবির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে নিহতদের গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল হবে বলে জানানো হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন





