নতুন বেতনকাঠামো চূড়ান্তে বিলম্ব হতে পারে

নতুন বেতনকাঠামো চূড়ান্তে বিলম্ব হতে পারে
Amar Desh

সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল এখনো চূড়ান্ত হয়নি। গতকাল বুধবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির ষষ্ঠ বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামোর সুপারিশ অনুমোদনের প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। বরং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরো পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সামনে আরো কয়েকটি বৈঠকের পর চূড়ান্ত সুপারিশ মন্ত্রিসভার কাছে পাঠানো হবে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্যই নয়, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্যও প্রযোজ্য হবে। তাই এর আর্থিক প্রভাব, বাস্তবায়নের সময়সূচি এবং বিভিন্ন গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার নিয়ে সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে চায়।

বৈঠকে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, পে স্কেলের অধিকাংশ বিষয়েই নীতিগত অগ্রগতি হয়েছে। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে আরো বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য সামনে আরো কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এরপরই চূড়ান্ত সুপারিশ অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার কাছে পাঠানো হবে।

বর্তমানে আলোচনায় থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ধরন। জাতীয় বেতন কমিশন সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি চাইছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই নতুন স্কেলের পুরো মূল বেতন কার্যকর করা হোক। অন্যদিকে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতাপরবর্তী অর্থবছরে ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রিসভা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন পে স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে দেওয়া দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকার অন্তর্বর্তী বিশেষ ভাতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে। কারণ নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে অধিকাংশ কর্মচারীর মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে।

নিম্ন গ্রেডে বেশি সুবিধা

অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের পে স্কেলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীদের বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে সরকার।

প্রাথমিক আলোচনায় ১ম থেকে ৯ম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির একটি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। তবে অন্য একটি প্রস্তাবে প্রথম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত ১০০ শতাংশ এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির বিষয়ও রয়েছে। কোন প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হবে, তা নির্ধারণ করবে মন্ত্রিসভা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ওপর পড়েছে। তাই সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বাড়ানোর পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম বেতনভোগীদের বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

কমিশনের সুপারিশে যা ছিল

২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা, যাতায়াত ভাতা পুনর্নির্ধারণ এবং বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়।

তবে সরকার কমিশনের সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়নের পরিবর্তে আর্থিক সক্ষমতা ও বাজেট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে।

আইএমএফের সতর্কতাও বিবেচনায়

নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর অবস্থানও আলোচনায় এসেছে। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় বৃদ্ধিতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে আসছে। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাই সরকারের সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি। দীর্ঘদিন নতুন পে স্কেল না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই সরকার এগোচ্ছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর গত এক দশকে নতুন কোনো বেতন কাঠামো ঘোষণা হয়নি। এ সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েক দফা বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়ন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন হলে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। তাই অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং রাজস্ব সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সরকার ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথ বেছে নিতে পারে।

এখন জাতীয় বেতন কমিশন সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির সামনে আরো কয়েকটি বৈঠক বাকি। সেসব বৈঠকে সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার পর তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কার্যকর হবে নবম জাতীয় পে স্কেল। সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা, এবার আর সিদ্ধান্ত পিছিয়ে না গিয়ে দ্রুতই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা আসবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন