টমেটো আমদানিতে ডিএইর ‘সার্ভার সিন্ডিকেট’

* আইপি নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ

* ১২-১৩ প্রতিষ্ঠান পেল আইপি সুবিধা

টমেটো আমদানিতে ডিএইর ‘সার্ভার সিন্ডিকেট’
ছবি: সংগৃহীত

কাঁচা পণ্য আমদানির অনুমতি বা ইমপোর্ট পারমিট (আইপি) ইস্যুতে চরম বৈষম্য ও দ্বিচারিতার অভিযোগ উঠেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, দেশের স্বার্থ বা সাধারণ ভোক্তার কথা বিবেচনায় না নিয়ে কর্মকর্তাদের পছন্দের গুটিকয়েক আমদানিকারককে বিশেষ সুবিধা দিয়ে টমেটো আমদানির আইপি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি টমেটোর দাম ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে টমেটোর উৎপাদন থাকে না। তাই প্রতি বছর এ সময় বাজার স্থিতিশীল রাখতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর টমেটো আমদানির জন্য আইপি সার্ভার উন্মুক্ত করে। তবে চলতি বছর একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের স্বার্থরক্ষায় আইপি প্রদান প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

সূত্র জানায়, গত ৯ জুলাই সকাল ১০টায় আইপির আবেদন গ্রহণের জন্য সার্ভার উন্মুক্ত করা হয়। এরপর দুপুর ১টার মধ্যেই নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়ে বেলা ৩টার দিকে তড়িঘড়ি করে টমেটো আমদানির আবেদন অপশন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, সার্ভারটি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল, যাতে নির্দিষ্ট ১২-১৩টি প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের আবেদন গ্রহণ না হয়। ফলে আবেদন করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় দেশের প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠিত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বঞ্চিত ব্যবসায়ী আমার দেশকে বলেন, ডিএই এখন দেশের বা ভোক্তার স্বার্থ দেখছে না। যারা মোটা অঙ্কের ঘুস দিতে সক্ষম হয়েছেন, কেবল তাদেরই ব্যবসায়িক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। দেশে শতাধিক কৃষিপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান থাকলেও কারওয়ান বাজার, শ্যামবাজার, সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর এবং সিলেটকেন্দ্রিক মাত্র ১২-১৩টি প্রতিষ্ঠানই বারবার আইপির অনুমোদন পাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সিলেটের জকিগঞ্জের ‘পূবালী ট্রেড লিংক’ এবং কারওয়ান বাজারের ‘স্বদেশ ফার্ম’ অন্যতম। এছাড়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর ও ঢাকার শ্যামবাজারকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অংশ বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রতিটি স্থলবন্দরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ (কোয়ারেন্টাইন) অফিস রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব মাঠ পর্যায়ের অফিসের মাধ্যমেই কোটি কোটি টাকার অনৈতিক লেনদেন সম্পন্ন হয়। মাঠ পর্যায় থেকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পাওয়ার পরই ঢাকা থেকে দ্রুত আইপি অনুমোদন দেওয়া হয়।

নিয়মানুযায়ী এক হাজার টন টমেটো আমদানির সরকারি ফি ভ্যাটসহ পাঁচ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রথম এক টনের জন্য ১০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি টনের জন্য এক টাকা করে ফি নির্ধারিত। তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকারি ফির বাইরে আইপি পেতে প্রতিষ্ঠানভেদে মোটা অঙ্কের উৎকোচ দিতে হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আমদানিকারক আমার দেশকে বলেন, সরকারি ফির বাইরে আগে সাধারণত ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা ‘হাদিয়া’ দিতে হতো। কিন্তু এবার অঙ্কটা আরো বেড়েছে। পাশাপাশি সার্ভার কারসাজির কারণে প্রতিযোগিতার সুযোগ থেকেও আমরা বঞ্চিত হয়েছি।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের দাবি, যারা বিপুল পরিমাণ ঘুস দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তারা যাতে বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা করে ওই অর্থ তুলে নিতে পারেন, সে কারণেই আইপি সার্ভার দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ সার্ভার উন্মুক্ত থাকলে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হতো এবং ভোক্তারা কম দামে টমেটো কিনতে পারতেন। বর্তমানে মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে পুরো বাজার জিম্মি হয়ে পড়ায় আমদানিকারক ও আড়তদারদের নির্ধারিত উচ্চমূল্যেই খুচরা বিক্রেতা ও সাধারণ ভোক্তাদের টমেটো কিনতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ আবদুর রহিম আমার দেশকে বলেন, বাজার পরিস্থিতি ও কৃষকের স্বার্থ বিবেচনা করেই আমরা আমদানির অনুমোদন দিয়ে থাকি। বাজারে ঘাটতি থাকায় কিছু আমদানিকারককে টমেটো আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আরো অনেকে যোগাযোগ করছেন। আপাতত নতুন করে কাউকে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। সার্ভার বন্ধ রাখা, ঘুস লেনদেন এবং সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন