শতাধিক গ্রিন শিপইয়ার্ড করার পরিকল্পনা সরকারের

শতাধিক গ্রিন শিপইয়ার্ড করার পরিকল্পনা সরকারের
আমার দেশ গ্রাফিক্স

বৈশ্বিক বাজারে পুরোনো জাহাজের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে কাজে লাগাতে এবং পরিবেশবান্ধব জাহাজ রিসাইক্লিং খাতকে আরো সম্প্রসারণ করতে চায় সরকার। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে গ্রিন শিপইয়ার্ডের সংখ্যা শতাধিক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৩১টি গ্রিন সার্টিফায়েড শিপইয়ার্ড রয়েছে। এছাড়াও ৬-৭টি শিপইয়ার্ডকে গ্রিন সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে জাহাজ নির্মাণ বা শিপ বিল্ডিং খাতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং উন্নত ডিজাইন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও বিশেষ ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশসম্মত এই শিল্প খাতের টেকসই উন্নয়নে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চারটি আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নি সংস্থাও। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবেশবান্ধব এই খাতের যথাযথ বিকাশ ঘটলে ভবিষ্যতে প্রতিবছর দেশীয় অর্থনীতিতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে জাহাজ রপ্তানি সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ ও নকশা তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

জাহাজ নির্মাণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ খাতে রপ্তানি বাড়াতে নীতিগত ও অবকাঠামোগত সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, গত বছর পর্যন্ত বিশ্ববাজারের মোট শিপ রিসাইক্লিংয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই ভারত ও বাংলাদেশের দখলে ছিল, কারণ উন্নত দেশগুলো সাধারণত এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বা ভারী কাজগুলো করে না।

তিনি আরো বলেন, আগামী ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে প্রচুর পুরোনো জাহাজ ভাঙার বা রিসাইক্লিংয়ের জন্য আসার সম্ভাবনা রয়েছে। একটি দক্ষ ইয়ার্ড বছরে ৩ থেকে ৪ বার এই কাজ করতে পারে। শিপ বিল্ডিংয়ের জন্য একটি দুই ফেজের বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। জাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স বা বিধিমালা প্রতিপালন সবচেয়ে জরুরি। ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর কাছ থেকে অর্ডার পেতে হলে কমপ্লায়েন্স হওয়া বাধ্যতামূলক, সক্ষমতা থাকার পরও কমপ্লায়েন্স না থাকলে তারা অর্ডার দেবে না। কমপ্লায়েন্সের পাশাপাশি ডিজাইন সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচামাল দেশীয় উৎস ছাড়াও প্রয়োজনে বাইরে থেকে সংগ্রহ করা যাবে, যা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ফিন্যান্সের কোনো সংকট নেই এবং ডিজাইন সক্ষমতা বাড়াতে ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে একটি বিশেষ সেন্টার বা কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বেসরকারি শিপইয়ার্ডগুলোর রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে ব্যাংক গ্যারান্টিকে বড় বাধা। এ সমস্যা সমাধানে নৌবাহিনীর অধীন ডকইয়ার্ডগুলোর সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি ‘হাইব্রিড মডেল’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকারি তত্ত্বাবধানে ব্যাংক গ্যারান্টি সুবিধা কাজে লাগিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জাহাজ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করতে পারবে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো নির্মাণে ঋণ দিতে চায় চার আন্তর্জাতিক সংস্থা

অন্যদিকে জাহাজ নির্মাণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাসক্ষম করে তুলতে বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ‘ট্রিটমেন্ট, স্টোরেজ অ্যান্ড ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি’ (টিএসডিএফ) স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়ন করতে জাইকা, এডিবি, বিশ্বব্যাংক এবং চীনের একটি ব্যাংক আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে অর্থায়নটি বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে হবে নাকি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে এখনো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পর্যালোচনা চলছে। শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে টিএসডিএফ স্থাপনের জন্য ৫৯.৩৫ একর জমি চিহ্নিত করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাপান মেরিন সায়েন্সের (জেএমএস) সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় এই অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা খরচের কথা বলা হয়েছে।

এর মধ্যে জাইকার প্রস্তাবনায় দেখা গেছে, সংস্থাটি ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদান করতে চায়। তারা ৩০ বছরে এই ঋণ ফিরিয়ে নেবে যেখানে ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হবে। তবে এডিবি প্রস্তাব দিয়েছে আরো চড়া সুদে ঋণ প্রদানের। সংস্থাটি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে চায় এবং পরিশোধের সময় দেবে ২০ বছর। বিশ্বব্যাংক অবশ্য তাদের প্রস্তাবে ২০ বছর মেয়াদি এই ঋণের সুদহার নির্ধারণ করতে চায় ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত। তবে সবচেয়ে কম সুদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে চীনের একটি ব্যাংক। ব্যাংকটি ৩ শতাংশ সুদে ২০ বছর মেয়াদে ঋণ প্রদানে আগ্রহ দেখিয়েছে।

সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্প বিষয়ে জাহাজ শিল্প সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন, বিধি, নীতিমালা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় পর্যালোচনা এবং সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটি একটি সভা করেছে।

সভায় পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, টিএসডিএফ না থাকায় ইউরোপীয় জাহাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বাংলাদেশে কাজ করতে দ্বিধা করছে এবং বিকল্প গন্তব্য বেছে নিচ্ছে। ফলে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ইউরোপীয় জাহাজে বিভিন্ন ধরনের উন্নতমানের পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান থাকে। এসব জাহাজ আকৃষ্ট করতে প্রয়োজনীয় বর্জ্য শোধন, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশগত মান নিশ্চিত করে শিল্পটির প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করতে টিএসডিএফ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন