এনবিআরে গুমোট পরিস্থিতি আতঙ্কে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা

এনবিআরে গুমোট পরিস্থিতি আতঙ্কে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা

শুরু হয়েছে নতুন অর্থবছর। কিন্তু অর্থবছরের শুরুতেই বড় ধরনের গুমোট পরিস্থিতি বিরাজ করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর)। তিন সদস্যসহ ও এক কমিশনারকে বাধ্যতামূলক অবসর, এক কমিশনারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত এবং সদস্যসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান শুরু হওয়ার ঘটনায় নানামুখী আতঙ্কে রয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এর মধ্যেই আবার নতুন করে পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করার কথা জানিয়েছে দুদক। এমন পরিস্থিতিতে কার ভাগ্যে কী ঘটবে, এ নিয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে সাধারণ কর্মচারী-সবার মধ্যেই বিরাজ করছে অস্থিরতা।

নতুন করে দুদকের তদন্তের আওতায় আসা পাঁচ কর্মকর্তা হলেন-বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার মো. কামরুজ্জামান, ঢাকা পূর্ব কাস্টমস এক্সসাইজ অ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার কাজী মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, আয়কর গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার ও ঐক্য পরিষদের মহাসচিব সেহেলা সিদ্দিকা, উপ-কর কমিশনার মামুন মিয়া ও কর পরিদর্শক লোকমান আহমেদ। এ নিয়ে এনবিআরের মোট ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তে নামার খবর জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য আমার দেশকে বলেন, এনবিআরের ইতিহাসে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনো পড়তে হয়নি। এ অবস্থায় কাজের প্রতি মনোনিবেশ করা খুবই কঠিন। সবার মধ্যে এক ধরনের মানসিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। নতুন অর্থবছরে নতুন উদ্যমে কাজ করার পরিবর্তে কার ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে-এটিই এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অতিরিক্ত কমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, পরিস্থিতি এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বাড়তি কাজ করার পরিবর্তে রুটিন ওয়ার্ক করাটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে- এ ধরনের কর্মকর্তাদের মধ্যে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো; অপর কর্মকর্তাদের মধ্যে দুদকের অনুসন্ধান, বরখাস্ত, বদলি আতঙ্ক কাজ করছে। সাধারণত প্রতি অর্থবছরের শুরুতে বড় ধরনের বদলির ঘটনা ঘটে এনবিআরে। এটি খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। কিন্তু এবারের বদলিকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের বদলির ঘটনাটি অন্য বছরের মতো স্বাভাবিক মনে করার অবকাশ নেই। তারা আশঙ্কা করছেন, এবার অনেককে শাস্তিমূলক বদলি করা হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কর্মকর্তার একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সে তালিকা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ ধরনের তালিকার কথা বলা হলেও এনবিআরের দায়িত্বশীল কেউ এটি নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে তারাও এমনটি শুনেছেন বলে আমার দেশকে জানান। তারা বলেন, যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে এনবিআর কিংবা চেয়ারম্যানের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সরকারের উচ্চমহল থেকেই সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

গত ২৭ জুন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে ভাওয়াল রিসোর্টে সাক্ষাতের জন্য সময় নিয়েছিলেন এনবিআরের আন্দোলনকারীরা। অর্থ উপদেষ্টা তাদের জন্য অপেক্ষায়ও ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতে অস্বীকৃতি জানান। এ কারণে সরকারের উচ্চমহল ক্ষুব্ধ হয়। ফলে এনবিআরের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়।

এ ছাড়া ২৬ জুন এনবিআর চেয়ারম্যান, সদস্য ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে অর্থ উপদেষ্টার বৈঠকে আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার এবং ১ জুলাই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও কর্মসূচি প্রত্যাহার না করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন তারা। উপরন্তু পরদিন অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক না করার কারণে কঠোর অবস্থানে চলে যায় সরকার। এ কারণে কমপ্লিট শাটডাউনের দ্বিতীয় দিনে আন্দোলনকারীরা অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে সচিবালয়ে বৈঠকের জন্য গেলেও তাতে সাড়া দেননি তিনি। বরং সরকারের পক্ষ থেকে কড়া বার্তা পাঠানো হয়।

এনবিআরের আন্দোলনকে দুরভিসন্ধিমূলক ও অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে সবাইকে কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এরপর দুদকের পক্ষ থেকে এনবিআরের ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছেÑএমন সংবাদ প্রকাশের পর আন্দোলন থেকে পিছু হটে এনবিআর ঐক্য পরিষদ। ওইদিন রাতে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে একটি সমাঝোতার বৈঠক শেষে আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় পরিষদ।

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আন্দোলন প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হলেও তাতে সায় দেননি আন্দোলনকারীরা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে কর্মসূচি প্রত্যাহার করায় এ নিয়েও সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও গত শনিবার ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এনবিআরের আন্দোলন ও চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করা হয়। এনবিআরের আন্দোলনের কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে বলেও জানান তারা।

সূত্র জানায়, এনবিআর সংস্কার নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনে প্রথমদিকে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমর্থন ছিল। কিন্তু চেয়ারম্যানকে অপসারণের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের পেছনে ছিল বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন। ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এর সঙ্গে যুক্ত হন। এ ছাড়া সরকারকে বেকায়দায় ফেলার দুরভিসন্ধিও ছিল আন্দোলনকে ঘিরে। এসব কারণ ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই এনবিআরের কয়েকজন সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। এ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলার জন্য একজন কমিশনারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

দুদক আগে থেকেই এনবিআরের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করছিল। কিন্তু আন্দোলনের সঙ্গে নানাভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন-এমন কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন ছড়িয়ে পড়ছে নানা আতঙ্ক।

উল্লেখ্য, গত মে মাসে এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি বিভাগ গঠনে অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। কিন্তু অধ্যাদেশে প্রশাসনিক ক্যাডারদের আধিপত্য তৈরির সুযোগ রাখা হয়েছে-এমন দাবি তুলে আন্দোলন করে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ। পরে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা ও বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগে তার অপসারণের দাবিতে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা দেন তারা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন