সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য বিদেশি ‘কৌশলগত অংশীদার’ খুঁজছে সরকার

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য বিদেশি ‘কৌশলগত অংশীদার’ খুঁজছে সরকার

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসিতে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সক্ষমতা বাড়াতে এবার বিদেশি কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে সরকার। ব্যাংকটির মূলধন শক্তিশালী করা, খেলাপি ঋণ আদায়, তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একজন শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদার আনার এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে কাতার ব্যাংকটিতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি আরো কয়েকটি ইসলামি দেশের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকটির মূলধন শক্তিশালী করা, খেলাপি ঋণ আদায়, তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সক্ষমতা বাড়াতে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদার আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১৭ এবং ১৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর কাতার সফর করেন। সেখানে কাতার সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরই মধ্যে কাতার ব্যাংকটিতে বিনিয়োগের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি আরো কয়েকটি ইসলামি দেশের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, বিভিন্ন অনিয়ম জালিয়াতির কারণে দীর্ঘদিন আমানত ফেরত দিতে না পারায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক মিলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। ব্যাংকগুলোতে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীর সঞ্চয়ী হিসাবে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। পাঁচ ব্যাংকের মোট ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণের ৮৬ শতাংশ এখন খেলাপি। আর মূলধন ঘাটতি রয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি।

সরকারি মালিকানার ব্যাংক হিসেবে গত বছরের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করা ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে। ফলে ব্যাংকটি শুরুতেই দেশের অন্যতম বড় মূলধনভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। সে জন্যই সরকার বিদেশি কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আমার দেশকে বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসিকে গতিশীল ও স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় মূলধন সরবরাহ করা হয়েছে এবং এর পাশাপাশি বিদেশি কৌশলগত অংশীদার খোঁজা হচ্ছে। ব্যাংকটিকে পুরোপুরি কার্যকর (ফাংশনাল) করতে হলে আরো অর্থের প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারের সামনে দুটি বিকল্প রয়েছে—এক, সরকার নিজে আরো অর্থ জোগান দিতে পারে; দুই, কৌশলগত অংশীদার (স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার) যুক্ত করা। সরকার দ্বিতীয় বিকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। সম্প্রতি আমরা কাতার সফর করে তাদেরকে এ বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছি। এছাড়া মুসলিম বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশকেও এই প্রস্তাব দেওয়া হবে।

জানা গেছে, কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাতারের আগ্রহ তাই সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য ইসলামি দেশের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ সফল হলে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, সরকারের মূল লক্ষ্য ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম অর্থাৎ গ্রাহক আবার টাকা জমা দেবে এবং উত্তোলন করবে। সেটি চালু করা। গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এজন্য ব্যাংকটির সংকট সামাল দেওয়ার লক্ষ্যে আমানত সুরক্ষা ও ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি হিসাবের গ্রাহকদের মূল আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে গ্রাহকেরা তাদের হিসাব থেকে জমানো সম্পূর্ণ মূল অর্থ (প্রিন্সিপাল অ্যামাউন্ট) এককালীন তুলতে বা নগদায়ন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোনো মুনাফা পাবেন না তারা। এ জন্য আজ মঙ্গলবার থেকে আবেদন গ্রহণ করবে ব্যাংকটির শাখাগুলো।

ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় থেকে জারি করা এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনে সব বিভাগীয় প্রধান, জোনাল প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপকদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও নির্দেশনাবলি অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অপারেশনসের প্রধান সমন্বয়ক এ এফ সাব্বির আহমদ স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বিষয়টি জানানো হয়।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আবেদুর রহমান সিকদার আমার দেশকে বলেন, সরকারের সহযোগিতায় আমরা এখন ব্যাংকের ঘর গোছানোর কাজ করছি, যাতে দ্রুত স্বাভাবিক লেনদেন কার্যক্রম শুরু করা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও পরিচালনা পর্ষদের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সাধারণ গ্রাহকরা যাতে নতুন হিসাব খুলতে পারেন এবং নির্বিঘ্নে টাকা জমা ও উত্তোলন করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকরা চাহিদামতো টাকা তুলতে না পারার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, “গ্রাহকদের সুবিধার জন্য আজ মঙ্গলবার থেকে আবেদন নেওয়া শুরু হবে। প্রতিটি শাখায় প্রয়োজনীয় অর্থের চাহিদা পর্যালোচনা করে সেই অনুযায়ী টাকার জোগান দেওয়া হবে। এছাড়া, খেলাপি ঋণ আদায়ে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং একটি বিশেষ ‘ওয়ার রুম’ গঠন করা হয়েছে, যেখান থেকে ব্যাংকের সব কর্মী সরাসরি টাকা উদ্ধারের কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।”

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংক ইতোমধ্যে প্রায় ১০ হাজার মামলা করেছে। আরো মামলা করার প্রক্রিয়াও চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ব্যাংকটির ঋণ আদায়, পুনর্গঠন ও সার্বিক কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করছে। ঋণ উদ্ধারে ব্যাংকটি আলাদা ‘কালেকশন অ্যান্ড রিকভারি ওয়ার-রুম’ও গঠন করেছে। সেখানে বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, আইনি ব্যবস্থা এবং পুনরুদ্ধার কৌশল নিয়ে কাজ হচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন