দেশের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রেল যোগাযোগ জোরদারের লক্ষ্যে ৩ হাজার ৭৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রকল্পের আওতায় ২০০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ, চারটি রিলিফ ক্রেন ও চারটি আন্ডারফ্লোর হুইল লেদ মেশিন সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্প প্রস্তাবে ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি, ঋণের অর্থায়ন, পরামর্শক নিয়োগ এবং বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খরচ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করেছে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রায় সাত বছর আগের বাজারদর অনুসরণ করে নতুন ক্যারেজ ও সরঞ্জামের ব্যয় নির্ধারণ, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরামর্শক নিয়োগ, ভূতুড়ে খাতের সংস্থান, ২৫ লাখ টাকার ভ্রমণ ব্যয় এবং স্টেশনারি কেনায় ২০ লাখ টাকা বরাদ্দের মতো নানা অসংগতি উঠে এসেছে পিইসি সভায়। এসব খাতে ব্যয় কমানো ও অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দ বাদ দেওয়ার পাশাপাশি পুরো উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠনের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।
সভার কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩ হাজার ৭৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১ হাজার ১২১ কোটি ৪ লাখ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ ২ হাজার ৬৫৮ কোটি ২১ লাখ টাকা। এর প্রস্তাবিত মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত। পিইসি সভায় তা পরিবর্তন করে চলতি বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০৩০ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নির্ধারণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির বহরে বর্তমানে ১ হাজার ২৮২টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ রয়েছে। এর মধ্যে ৬৯৫টির বয়স ৩০ বছরের বেশি। আবার ৬৮১টি ক্যারেজ বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি নিয়ে চলাচল করছে। যান্ত্রিক বিধিমালা অনুযায়ী, একটি ক্যারেজের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ৩৫ বছর। পর্যাপ্ত বিকল্প না থাকায় মেয়াদোত্তীর্ণ বগিগুলোও বহরে রাখতে হচ্ছে। ফলে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় নতুন ক্যারেজ সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণে যথাযথ বাজার যাচাই না করায় আপত্তি জানিয়েছে কমিশন।
সভায় রেলওয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ক্যারেজ, প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন সরঞ্জামের ব্যয় প্রাক্কলনের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে বাস্তবায়িত ১৫০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ প্রকল্পের ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবরের মূল্যতালিকা অনুসরণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি যোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে রিলিফ ক্রেনের ব্যয় নির্ধারণে এডিবির অর্থায়নে রেলওয়ের আরেকটি প্রকল্পের বাজারদর বিবেচনা করা হয়েছে। এ অবস্থায় বর্তমান বাজারদর যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করে নতুন ব্যয় প্রাক্কলন তৈরির নির্দেশ দিয়েছে পিইসি।
অর্থায়নের ক্ষেত্রেও প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি পেয়েছে কমিশন। ডিপিপিতে এডিবির ঋণের কথা উল্লেখ থাকলেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও ঋণদাতা সংস্থার সম্মতিপত্র সংযুক্ত করা হয়নি। সভায় ইআরডির প্রতিনিধি ঋণের অর্থায়নের বিষয়ে নিশ্চয়তার কথা জানালেও এটি নন-কনসেশনাল বা কঠিন শর্তের ঋণ হবে বলে উল্লেখ করেন। এ অবস্থায় ইআরডির সম্মতিপত্র যুক্ত করে ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রেও ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনটি উপাদানের জন্য পৃথক পরামর্শক রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। পিইসি সভায় মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ-সংক্রান্ত পরামর্শক খাত বাদ দিয়ে বাকি দুটি কাজ একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রি-শিপমেন্ট পরিদর্শন ফি নির্ধারণের ভিত্তি ব্যাখ্যা করে ডিপিপি সংশোধন করতে বলা হয়েছে।
প্রকল্পের আনুষঙ্গিক খরচেও বড় ধরনের কাটছাঁটের নির্দেশ এসেছে। বিজ্ঞাপনের জন্য ১৬টি প্যাকেজের পরিবর্তে সাতটি নির্ধারণ করে বরাদ্দ ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা করতে বলা হয়েছে। বিবিধ স্টেশনারি কেনার ব্যয় ২০ লাখ থেকে কমিয়ে ৩ লাখ টাকা নির্ধারণের পাশাপাশি অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র কেনার খাত বাদ দিতে বলা হয়েছে। জরিপ ফি ৭৫ লাখ থেকে কমিয়ে ৪৫ লাখ টাকা করতে হবে। ভ্রমণ ব্যয় ২৫ লাখ থেকে কমিয়ে ২ লাখ টাকা নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রস্তাবিত টেস্টিং ফি খাত ডিপিপি থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
পরিবহন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও কেবল ট্রেইলার, লোডিং ও আনলোডিংয়ের খরচ রেখে রেলের মালামাল পরিবহনের প্রস্তাবিত ব্যয় বাদ দিতে বলা হয়েছে। দুটি ফোর হুইলার গাড়ি কেনার পরিবর্তে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ এবং প্রাইস কন্টিনজেন্সি ৩ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি ক্যারেজ ও মালামাল বন্দরে রাখার চার্জ পোর্ট রেট অনুযায়ী নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এছাড়া প্রকল্পের জনবল অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নির্ধারণ, সম্মানী খাতে কমিটি ও সভার সংখ্যা বিবেচনায় ব্যয় প্রাক্কলন এবং উৎসব খাত বাদ দিতে বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয় যৌক্তিকীকরণ ও অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দ ছেঁটে ফেলার মাধ্যমে ডিপিপি পুনর্গঠনের জন্য ১৩ দফা নির্দেশনা দিয়েছে পিইসি।
সভায় এসব নির্দেশনা প্রতিপালন করে দ্রুত সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ রেলের পুরোনো ক্যারেজ বদলে নতুন বগি সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও প্রস্তাবিত ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও বিভিন্ন খাতের অসংগতি দূর না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটির অনুমোদনের সুপারিশ চূড়ান্ত হচ্ছে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


