বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের পাওয়া বক্তব্যে এর রহস্য নতুন মোড় নিয়েছে। রিমান্ডে বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশা ও বন্ধু শাহরিয়ার রেজা দীপের বক্তব্য, দুই পরিবারের বর্ণনা এবং তদন্তে পাওয়া তথ্য সামনে আসার পর মৃত্যুকে ঘিরে নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রেমের সম্পর্ক, মাদক সেবন, ইয়াবা লেনদেন এবং মৃত্যুর আগের রাতের ঘটনাপ্রবাহ—সবকিছু মিলিয়ে ক্রমান্বয়ে জটিল হয়ে উঠছে তদন্ত। বিশেষ করে উত্তরার ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ তাহসিফ, গ্রেপ্তার দীপ ও দিশার একসঙ্গে অবস্থান, তাহসিফ-দীপের টঙ্গীর মাজার বস্তিতে যাত্রা এবং সেখান থেকে দীপের একা ফিরে আসার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার দিশা ও দীপকে চার দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। এরই মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত দ্বিতীয় দফায় দীপকে নতুন করে আরো তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
তদন্তকারীরা তাহসিফ, দীপ ও দিশার ফোনের কললিস্ট ও বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ, সিসিটিভি ফুটেজ এবং রিমান্ডে দুজনের বক্তব্যও মিলিয়ে দেখছেন। বিশেষ করে, দিশাকে বাসায় নামিয়ে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপের টঙ্গী যাত্রা, মাজার বস্তিতে যাওয়ার কারণ এবং সেখানে কী ঘটেছিল, তা নিখুঁতভাবে জানার চেষ্টা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, দিশা বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য দিলেও হত্যাকাণ্ড নিয়ে কিছু জানে না বলে রিমান্ডে দাবি করছে। অন্যদিকে, দীপের বক্তব্যেও কিছু অসংলগ্নতা দেখা যাচ্ছে।
এছাড়া, তাহসিফের সঙ্গে দিশার সম্পর্ক নিয়ে দুই পরিবার পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছে। তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম আমার দেশকে বলেন, দিশাকে তার সন্দেহজনক মনে হতো। দিশা তাহসিফের পেছনে ঘুরঘুর করত। নিজেই প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। তাহসিফ তাকে খুব বেশি পাত্তা দিত না। তারপরও দিশা তাকে বিরক্ত করত।
অন্যদিকে, দিশার পরিবার বলছে, মেয়েটি স্বভাবগতভাবে চুপচাপ। তার ভাই বোন ও কাজিনদের মধ্যে ভদ্র, শান্ত হিসেবে পরিচিত ছিল। পরিবার ও আত্মীয়দের সঙ্গে খুব বেশি খোলামেলা কথা বলত না। ফলে তাহসিফের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি প্রথমে তারা বুঝতে পারেননি।
একপর্যায়ে দিশার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন স্বজনরা। বাসা থেকে বের হওয়ার জন্য নানা অজুহাত দিতে থাকে দিশা। কখনো শিক্ষার্থী পড়ানোর কথা বলত। কখনো ছাদে যাওয়ার কথা বলে বেরিয়ে যেত। প্রায় নিয়মিত দিনে কিংবা রাতে তাহসিফের সঙ্গে দেখা করতে যেত। অনেক সময় রাতে দেরিতে বাসায় ফিরত।
বিষয়টি জানতে পারার পর পরিবার তাকে আটকানোর চেষ্টা করে। স্বজনদের দাবি, তাহসিফের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে দিশাকে বাসায় আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। গেট তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। একবার তার মা রাগ করে সিম ভেঙে ফেলেন। কিন্তু তাহসিফ ফোন করলে দিশা চাবি চুরি করে বেরিয়ে যেত।
নৌ পুলিশের মিডিয়া শাখার পুলিশ সুপার মাসুমা আক্তার আমার দেশকে বলেন, দিশা ও দীপের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই কোনো মন্তব্য করা যাচ্ছে না।
স্থানীয় ও দুই পরিবার সূত্রে জানা গেছে, উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ভেতরে রুয়াপ শপিং কমপ্লেক্স ও রেস্টুরেন্ট এলাকায় তাহসিফ-দিশার নিয়মিত দেখা হতো। সেখানে একটি সোসাইটি মাঠও রয়েছে। দুজন সেখানে হাঁটতেন, গল্প করতেন। ‘সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকস’ নামের খাবারের দোকানেও প্রায়ই তাদের আড্ডা ছিল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দিশা রিমান্ডে জানায়, সে ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষার্থীদের পড়াত। একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে চাকরিও করত। প্রায় এক মাস আগে তাহসিফের সঙ্গে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর তার চাকরি চলে যায়।
তদন্ত সূত্র বলছে, তাহসিফের বাসায়ও কয়েকবার গিয়েছে দিশা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। তাহসিফের মা ও পরিবারের অন্যরা তাকে চিনতেন। উভয় পরিবার একে অপরকে চিনত।
বারে দিশা, মদ ঢালছিলেন দীপ
তদন্ত সূত্র বলছে, ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার নেস্ট বারে গিয়েছিল দিশা। দুজনে সেখানে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে পৃথক মোটরসাইকেলে দীপও পৌঁছান। তিনজন একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করেন। বারে প্রায় দেড়ঘণ্টা অবস্থান করেন তারা। রাত ১১টা ৫১ মিনিটে বেরিয়ে যান।
রিমান্ডে দিশা জানিয়েছে, বারে দীপ বারবার তাহসিফকে মদ ঢেলে দিচ্ছিল। তবে দীপ নিজে মদ পান করছিল না। দিশার বক্তব্য অনুযায়ী, টঙ্গীতে গিয়ে তাহসিফ তাকে হেরোইন সেবনের প্রস্তাব দেয়। দিশা তাতে রাজি হয়নি বরং তাহসিফকে নিষেধ করে।
দিশা আরো জানায়, পরিচয়ের পর তাহসিফ তাকে দুইবার টঙ্গীর মাজার বস্তিতে নিয়ে যায়। সেখানে হেরোইন সেবন করত তাহসিফ, সঙ্গে দীপও থাকত নিয়মিত।
ইয়াবা লেনদেনের তথ্য
অন্যদিকে, তাহসিফের মৃত্যুর তদন্তে ‘আশা’ নামের আরো এক তরুণীর বিষয়টিও সামনে এসেছে। রিমান্ডে দিশা তদন্তকারীদের বলেছে, আশা নামের এক নারীর সঙ্গে তাহসিফের ২০০ পিস ইয়াবা লেনদেনের কথা চলছিল। তবে এর চেয়ে আর বেশি কিছু জানে না।
দিশা আরো জানায়, ডায়না নামে আরেক তরুণী ও তার স্বামী রাসেলের উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরে ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে। নিহত তাহসিফ, তার জুনিয়র বন্ধু দীপ, আশা এবং ডায়না ও তার স্বামী একই সামাজিক পরিমণ্ডলে চলাফেরা করতেন। সবাই মিলে আড্ডা দিতেন। মদ পান করতেন। কখনো কখনো ট্রাভেল এজেন্সিতেও তাদের আড্ডা বসত। তাহসিফের সঙ্গে এসব মানুষের যোগাযোগের সূত্র ধরে তাদের চিনত দিশা।
জানা গেছে, তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজন হলে অন্য যে কাউকেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকবে পুলিশ। আপাতত রাসেল, ডায়না ও আশাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে তদন্ত সূত্র জানিয়েছে।
সেই রাত ঘিরে যত প্রশ্ন
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখন কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। তাহলো- দিশাকে বাসায় নামিয়ে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ কেন টঙ্গীর মাজার বস্তিতে গেলেন? সেখানে মাদক সেবনের উদ্দেশ্যেই কি তাদের যাত্রা ছিল, নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল? তাহসিফের মোটরসাইকেল মাজার বস্তিতে ফেলে রাখা হলো কেন? দীপের বক্তব্য ও দিশার বক্তব্যের মধ্যে কতটা মিল রয়েছে।
এছাড়া, আশার সঙ্গে ইয়াবা লেনদেনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না? তাহসিফের মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে কার কার যোগাযোগ হয়েছিল? এই হত্যাকাণ্ডে ওই দম্পতি ও আশা নামের ওই নারীর যোগসূত্র রয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা।
সিসিটিভি ফুটেজ ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে তাহসিফের শেষ রাতের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের চেষ্টা চলছে। টঙ্গীর মাজার বস্তিতে প্রায় দুই ঘণ্টার অবস্থান এখনো রহস্যের কেন্দ্রে।
গত ২৮ অক্টোবর বিকালে উত্তরার রাজাবাড়ি ঘাট এলাকায় তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তার বাবা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


