বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ

ব্যাংক খাত বিলুপ্তির মুখে, অর্থনীতি এবার নদীতে পড়তে পারে

ব্যাংক খাত বিলুপ্তির মুখে, অর্থনীতি এবার নদীতে পড়তে পারে

অলিগার্কদের (অতি প্রভাবশালী ধনী ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী) প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করলে দেশের অর্থনীতি আরো গভীর সংকটে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেন, দেশের ব্যাংক খাত অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এ খাতের অস্তিত্বই হুমকির মুখে। অর্থনীতি ইতিমধ্যে লাইনচ্যুত হয়েছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে তা শুধু লাইনচ্যুতই হবে না, নদীতে গিয়ে পড়তে পারে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মিলনায়তনে ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, শুরুতে ব্যাংক খাতের সংকটকে গ্রাহক চেনাসংক্রান্ত (কেওয়াইসি) সমস্যা মনে করা হলেও পরে তা ব্যাংকার, অসৎ ব্যবসায়ী ও অসাধু রাজনীতিবিদদের বিপজ্জনক যোগসাজশে পরিণত হয়েছে। এ ধরনের সিন্ডিকেট ও অলিগার্কদের প্রশ্রয় দিয়ে অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফেরানো সম্ভব নয়। তাই তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

দেশের অর্থনীতির কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি শোষণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এ শোষণের সুবিধা পাচ্ছে সাধারণ মানুষ নয়, বরং অল্পসংখ্যক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব অলিগার্কের উত্থান হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাজারের নিয়ম অনুসরণ করা হলে দেশের অধিকাংশ ব্যাংক এত দিনে বিলুপ্ত হয়ে যেত। কিন্তু বিভিন্ন উপায়ে সেগুলো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। এ প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এটি দেশের মানুষ ও অর্থনীতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি।

ব্যাংক খাতে অনিয়মের কারণে মানুষের আস্থা ব্যাপকভাবে কমে গেছে উল্লেখ করে মাহবুব উল্লাহ বলেন, অধিকাংশ মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছেন। তবে এই সংকটের মধ্যেও কিছু ব্যাংক ভালো করছে এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এসব ব্যাংকের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে খাতটির উন্নয়নে করণীয় নির্ধারণ করা যেতে পারে।

সরকারের ঋণনির্ভরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, রাজস্ব ঘাটতি ও দুর্বল কর-জিডিপি অনুপাতের কারণে সরকারকে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে ব্যাংক খাত ক্রমেই সরকারমুখী হয়ে পড়ছে এবং বেসরকারি খাত ঋণপ্রাপ্তিতে চাপে পড়ছে। অর্থনীতিতে এ পরিস্থিতি ‘ক্রাউডিং আউট’ বা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

তিনি বলেন, সরকারের নিয়মিত ঋণ গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এসব ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের অনিশ্চয়তা অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কসংকেত। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সামগ্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা জরুরি।

রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন নিয়ে সমালোচনা করে মাহবুব উল্লাহ বলেন, ক্ষমতাসীনরা রাষ্ট্রকে জনগণের কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের পরিবর্তে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা সাম্রাজ্যে পরিণত করেছেন। এর মাধ্যমে আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের অন্যায্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের এ শোষণমূলক চরিত্র পরিবর্তন করে জনকল্যাণমুখী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা না গেলে কোনো খাতেরই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, দেশে বারবার গণঅভ্যুত্থান ঘটলেও অর্থপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আসেনি। এতে মানুষের মধ্যে হতাশা ও অধৈর্য বাড়ছে। শুধু অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামো, জাতীয় পুনর্জাগরণের কর্মসূচি ও নিবেদিত নেতৃত্ব।

দেশের বর্তমান সংকটের দ্রুত সমাধান নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, সংকট কাটিয়ে উঠতে সময় ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। রাতারাতি কোনো জাদুকরি সমাধান সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক সংশোধন এবং ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের অনৈতিক যোগসাজশ বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতি ও ইচ্ছাকৃত অনিয়মের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও জরুরি।

খেলাপি ঋণ আদায় ও সুশাসনে জোর

সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা। তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণের পাহাড়, সুশাসনের অভাব, মূলধনসংকট ও অর্থ পাচারের কারণে দেশের ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে অনেক ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমেছে। অন্যদিকে, কিছু ব্যাংকে তীব্র তারল্যসংকট থাকলেও পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ অর্থ অলস পড়ে রয়েছে।’

এই সংকট কাটাতে খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন নিশ্চিত করা, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং অর্থ পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি।

বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন