২৩ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দুই লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা

রোহান রাজিব

২৩ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দুই লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে ২৩ ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি হয়েছে দুই লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে এসব ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ছিল এক লাখ ৫৫ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের সময় অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থঋণ আকারে বের করে নেওয়া হয়। এসব ঋণখেলাপি হলেও সে সময় তা হিসাব করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লুকানো খেলাপি ঋণ সামনে নিয়ে আসা হয়।

বিজ্ঞাপন

এতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। খেলাপির বিপরীতে যে পরিমাণ নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখার দরকার ছিল, তা-ও রাখতে পারেনি এ ব্যাংকগুলো। এ সময় প্রভিশন ঘাটতি হয় তিন লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। বিপুল প্রভিশন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়ে। দেশের বাকি ব্যাংকগুলোর মূলধনে কোনো ধরনের ঘাটতি নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মূলধন ঝুঁকিজনিত সম্পদের অনুপাত (সিআরএআর) ঋণাত্মক হয়েছে ২ দশমিক ৯০ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক কাঠামো অনুযায়ী ন্যূনতম ১০ শতাংশ থাকা উচিত। গত জুন শেষে সিআরএআর ইতিবাচক ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। সিআরএআর হচ্ছে, একটি ব্যাংকের মূলধন ও তার ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত, যেখানে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সম্পদের হিসাব নির্ধারণ করা হয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের ঘাটতি ৩৭ হাজার কোটি টাকা

ব্যাংক খাতের মোট মূলধন ঘাটতির মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের চারটি ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ৩৭ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি জনতা ব্যাংকের ১৯ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। এরপর অগ্রণী ব্যাংকের আট হাজার ১২৫ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের পাঁচ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের তিন হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা।

বেসরকারি ৯ ব্যাংকের ঘাটতি ৩৬ হাজার কোটি টাকা

গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি খাতের ৯টি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়ে। এসব ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে। ৩৬ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ন্যাশনাল ব্যাংকের। এ ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি এবি ব্যাংকের সাত হাজার ২০৫ কোটি টাকা। এরপর পদ্মা ব্যাংকের ঘাটতি পাঁচ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের চার হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের চার হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের এক হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) এক হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, এনআরবিসি ব্যাংকের ৪৩৬ কোটি টাকা এবং সীমান্ত ব্যাংকের ৩৪ কোটি টাকা।

আট ইসলামি ব্যাংকের ঘাটতি এক লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা

ব্যাংক খাতের মোট মূলধন ঘাটতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে। গত সেপ্টেম্বর শেষে এ খাতের ব্যাংকগুলোর ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭৫ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের। সেপ্টেম্বর শেষে এ ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৫ হাজার ৯০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইউনিয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২৭ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। এরপর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ২২ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ২২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২২ হাজার ১১৪ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ১৩ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের দুই হাজার ১২ কোটি টাকা এবং আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের ১৩৮ কোটি টাকা।

দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের ঘাটতি ৩২ হাজার কোটি টাকা

বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। তথ্য অনুযায়ী সেপ্টেম্বর শেষে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, খেলাপি বাড়লে প্রভিশনও বেশি রাখতে হয়। ব্যাংকগুলো মুনাফা নতুন করে না করতে পারায় প্রভিশন ঘাটতিও বাড়ছে। ফলে ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। এসব ব্যাংকের কারণে ব্যাংক খাতে সিআরএআর ঋণাত্মক হয়ে গেছে। যদিও এসব ব্যাংক ছাড়া বাকি ব্যাংকগুলোর অবস্থা ভালো।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন