একীভূত হওয়ার পর পাঁচ ব্যাংককে ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা ধার

রোহান রাজিব

একীভূত হওয়ার পর পাঁচ ব্যাংককে ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা ধার

দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। একীভূত হওয়ার পরও এসব ব্যাংককে টাকা ছাপিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা তিন মাসের জন্য ধার বা ঋণ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। ব্যাংকাররা জানান, একীভূত করার আলোচনা শুরুর পর থেকেই ব্যাংকগুলো থেকে টাকা উত্তোলনের চাপ বাড়তে থাকে। এই চাপ সামাল দিতে বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য সহায়তা দেয়।

আলোচ্য ব্যাংকগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। পাঁচটির মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস’ (বিএবি)-এর সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। বাকি চারটি ছিল চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের কর্ণধার ও আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তারা দুজনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এসব ব্যাংকে নামে-বেনামে তাদের শেয়ার রয়েছে এবং ঋণের সুবিধাভোগীও তারা। তাদের নেওয়া ঋণের অর্থ ফেরত না আসায় ব্যাংকগুলো সংকটে পড়ে। পরবর্তী সময়ে এসব ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়ার পর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৪১৬ কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে এ ব্যাংকের মোট ধারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে দেওয়া হয় ৪৮২ কোটি টাকা, যার মোট ধার ১০ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে এক্সিম ব্যাংককে দেওয়া হয় এক হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা; ব্যাংকটির মোট ধার ১২ হাজার ১০ কোটি টাকা। এছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংকের ধার ১৬১ কোটি টাকা, যার মোট ধারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে দেওয়া হয় ৯৮ কোটি টাকা; এ ব্যাংকের মোট ধার তিন হাজার তিন কোটি টাকা।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তারল্য সংকটে থাকা এই পাঁচটি ব্যাংক মিলে গঠিত হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আসবে আমানতকারীদের শেয়ার থেকে। এছাড়া প্রায় ৭৮ লাখ আমানতকারীর জন্য আমানত বীমা তহবিল থেকে মাথাপিছু ২ লাখ টাকা করে মোট ১২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সেই তহবিল থেকে টাকা পরিশোধও করা হচ্ছে।

গত সরকারের সময় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। ওই পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়াকে নিয়োগ করা হয়। তিনি সরকারের সাবেক সচিব। সম্প্রতি তিনি চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।

এর আগে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নানা প্রক্রিয়া শেষে নাবিল মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) ছিলেন। তবে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনি যোগ দেননি। বর্তমানে নতুন এমডি নিয়োগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার পাঁচ ব্যাংকের নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। এ সময় তিনি জানান, পাঁচ ব্যাংক থেকে ঋণের নামে আত্মসাৎ করে পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে চলতি এপ্রিলের মধ্যে বিদেশি আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অপ্রকাশযোগ্য (এনডিএ) চুক্তি করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সম্পদ উদ্ধার করে এসব ব্যাংক সচল করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ।

গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা বা ৯৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৬০ হাজার ১১৭ কোটি টাকা বা ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বা ৮০ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা বা ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...