বন্ধের পথে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক বসছে রোববার

বন্ধের পথে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক বসছে রোববার

দুর্বল পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে আগামী রোববার এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রশাসক নিয়োগের দিনই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ স্থগিত করা হবে। একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) চুক্তিও বাতিল করা হবে। সরকার ইতোমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বন্ধ হতে যাওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো—পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, আভিভা ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিকভাবে পিপলস লিজিং ছাড়া বাকি চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রোববার প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। পিপলস লিজিংকে ঘিরে মামলা-সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। এ বিষয়ে আদালতের আদেশ এখনো পাওয়া যায়নি। আগামী সপ্তাহে আদালতের আদেশ পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানটিতেও প্রশাসক বসানো হবে।

জানা গেছে, গত বছরের মে মাসে গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ ২০টি এনবিএফআইয়ের নিবন্ধন সনদ বা লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সে সময় কেন তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়। পরে ২০টির মধ্যে ৯টি প্রতিষ্ঠানকে প্রথম ধাপে বন্ধের জন্য বেছে নেওয়া হয়, কারণ তাদের জবাব সন্তোষজনক ছিল না। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বাকি চারটিকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য তিন মাস সময় দেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে তারা পরিস্থিতির উন্নতি করতে না পারলে সেগুলোকেও বন্ধ করা হবে।

ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সময় পাওয়া চারটি প্রতিষ্ঠান হলো—প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফসি) এবং প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, প্রাথমিকভাবে চারটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে ৯টি প্রতিষ্ঠানের জন্যই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। তিন মাস সময় পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো এ সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় চলে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। শিগগিরই এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। আর পিপলস লিজিংয়ের ক্ষেত্রে যে আইনি জটিলতা রয়েছে, সেটিও দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।

খেলাপি ঋণ প্রায় শতভাগ

বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাপক অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণেই এসব প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এত বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের (বর্তমানে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিকে হালদারের বিরুদ্ধে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি থেকে অন্তত সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে মোট আমানতের পরিমাণ ১৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পিপলস লিজিংয়ে রয়েছে ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৩ হাজার ১২ কোটি টাকা, আভিভা ফাইন্যান্সে ৫ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা, এফএএস ফাইন্যান্সে ১ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৪৪৯ কোটি টাকা।

জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি আমানতকারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। একজন ব্যক্তি আমানতকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন। পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি আমানতের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন বা বন্ধ হলে একজন আমানতকারীর জমা যতই থাকুক না কেন, আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ফেরত পাওয়া যায়। পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায় বা সম্পদ বিক্রি করে আনুপাতিক হারে অর্থ পরিশোধ করা হয়। তবে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনতে এসব প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের সরকার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হবে।

অন্যদিকে, ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সময় পাওয়া চারটি প্রতিষ্ঠানে মোট আমানতের পরিমাণ ২ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে ৬৩৫ কোটি টাকা, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডে ২৬০ কোটি টাকা, বিআইএফসিতে ৫৪০ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডে ৯৭৬ কোটি টাকা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন