সরকার প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারছে না। তাই পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া বাড়িয়েছে । চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩,২৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, দুই মাসে সরকারের ঋণ নেওয়া বেড়েছে ৪১০ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আগে থেকেই দেশের বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। ইতোমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো চালু রয়েছে, সেগুলোও ধুঁকছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের চাহিদা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায় ২০ শতাংশ কমেছে। ফলে সরকারের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক থেকেই ঋণ নিতে হচ্ছে। কারণ, এ মুহূর্তে সরকারের সামনে বিকল্প অর্থায়নের পথও সীমিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ নিলেও এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ৩,৭২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। ফলে এ দুই মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময় নিট ঋণ ৭,৪৮৬ কোটি টাকা ঋণাত্মক ছিল।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে মোট এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সে হিসাবে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার ১১.৪৯ শতাংশ ঋণ নিয়েছে সরকার।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য প্রায় সাত লাখ কোটি টাকার যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। অতীতের কোনো সময়ই এনবিআর এ ধরনের লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি যেতে পারেনি। বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকট বা বিশৃঙ্খলা না থাকলেও অতীতের রেকর্ড অনুযায়ী এত বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি। মূলত সরকারের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবেই এ বাস্তবতাহীন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাহিদ হোসেন আরো বলেন, আগামীতে সরকারের ঋণের বোঝা ও আর্থিক চাপ আরো বাড়বে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ফলে আগামী দুবছরের মধ্যে সরকারের পরিচালন ব্যয়ে ন্যূনতম এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত যোগ হবে। এর পরোক্ষ প্রভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতার ব্যয়ও বাড়বে। এ ছাড়া বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সহায়তা থাকলেও এসব প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব অর্থেরও বড় অংশগ্রহণ রয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা খাতে নতুন কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে ভর্তুকির ব্যয়ও বেড়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমানো গেলেও তা পুরোপুরি কমানো সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে সরকারের ব্যয়ের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। অন্যদিকে অদূর ভবিষ্যতে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা নেই। এমনকি আগের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ধরে রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে আয় না বাড়িয়ে ব্যয়ের চাপ বাড়তে থাকলে বাজেট ঘাটতি আরো বাড়বে। আর বাজেট ঘাটতি বাড়লে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার চাহিদাও ধীরে ধীরে আরো বাড়বে।
তথ্য অনুযায়ী ৩০ আগস্ট শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৮,০২৫ কোটি টাকা। গত জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৯১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের স্থিতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। গত জুনে এর পরিমাণ ছিল ৯৪ হাজার ৫১ কোটি টাকা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


