বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সিলেট-ছাতক রেলপথে সংস্কারকাজ চলছে । এতে চার বছর ধরে এই রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে । এই সংস্কারকাজ ধীরগতিতে হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি । সংস্কারকাজের মাত্র ২০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে । এই পরিস্থিতিতে এ রেলপথে বাড়ছে মানুষের ভোগান্তি ।
জানা গেছে, সিলেটের শিল্পনগরী ছাতক থেকে চুনাপাথর, সিমেন্ট, বালু পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন এবং সুনামগঞ্জের মানুষের সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল সিলেট ছাতক রেলপথ। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় রেলপথটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রায় চার বছর ধরে বন্ধ রয়েছে ট্রেন চলাচল। এর মধ্যে চুরি হয়েছে রেললাইনের লোহার পাত ও মূল্যবান স্লিপারও। দীর্ঘদিন পর ২১৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে রেলপথটি পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাজ এগিয়েছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। ফলে কবে নাগাদ সিলেট-ছাতক রেলপথে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশের প্রায় ৩৪ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথ পুনর্বাসনের জন্য ২০২৫ সালে প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০২২ সালের বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশের পুনর্বাসন প্রকল্প নামের এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা। জিওবি ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেড। একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করে রেলওয়ে। তবে প্রকল্পের মোট ব্যয় ২১৭ কোটি টাকা হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির পরিমাণ প্রায় ১৯৯ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল চলতি বছরের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত। নির্ধারিত সময় শেষ হলেও প্রকল্পের বড় অংশের কাজ এখনো বাকি রয়েছে ।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়। ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। মাটিভরাট ও কালভার্ট নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ সংস্কার, মাটিভরাট, কালভার্ট ও সেতু মেরামত, নতুন স্লিপার স্থাপন এবং নতুন রেললাইন বসানোর কাজ রয়েছে। ইতোমধ্যে ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পুরোনো রেললাইন অপসারণ করা হয়েছে। তবে নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখনো শেষ হয়নি।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ, হাসনাবাদ, কালারুকা, মাধবপুর, ছৈলা-আফজলাবাদ, সৎপুর এবং সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চিসহ বিভিন্ন এলাকায় সংস্কারকাজ ধীরগতিতে চলছে। কোথাও কোথাও কাজ বন্ধ থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুফি আলম সোহেল বলেন, ছাতকের সিমেন্ট, চুনাপাথর, বালু ও পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে সিলেট ছাতক রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পাশাপাশি কম খরচে সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করা যেত। বন্যার পর থেকে রেলপথ বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ছাতকের জাউয়া বাজার এলাকার ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন বলেন, রেলপথের সংস্কার শুরু হলে স্থানীয়দের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছিল। বিভিন্ন স্থানে কিছুদিন কাজ চললেও পরে কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে। কাজ বন্ধ থাকার কারণ সম্পর্কে স্থানীয়রা স্পষ্ট কোনো তথ্যও পাচ্ছেন না।
সিলেট-ছাতক রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সিলেট রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মাসুদ পারভেজ বলেন, ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। মাটিভরাট ও কালভার্টের কাজও চলছে। তিনি বলেন, প্রকল্পের প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে, বাকি রয়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। ২৩ আগস্ট প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে। এখন মেয়াদ বাড়ানো ও পরবর্তী বাস্তবায়ন বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের প্রকল্প প্রকৌশলী সজিবুর রহমান নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার কারণ সম্পর্কে বলেন, ঝড়-বৃষ্টির কারণে বছরের বড় একটি সময় কাজ করা সম্ভব হয় না।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, বৃষ্টি ও বর্ষার কারণে সময়মতো মাটির কাজ করা সম্ভব হয়নি। দেড় বছর মেয়াদের প্রকল্পের মধ্যে দুটি বর্ষাকাল থাকায় কাজ ব্যাহত হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের সব কাজ চলমান রয়েছে। তিনি জানান, এ পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় ২০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে আরো এক বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

