দেশের বেকারত্ব নিরসনে পাঁচ বছরে সরকারি ও বেসরকারি খাতে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের পরই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তোড়জোড় শুরু করেছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের শূন্য পদে নিয়োগ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান শূন্য পদের হালনাগাদ তালিকা চাওয়ার পাশাপাশি নিয়োগ কার্যক্রম কতদূর এগিয়েছে, সে বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কাছে তথ্য চেয়েছে।
ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সোনালী ব্যাংক ছাড়া অন্য ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা খুবই নাজুক। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত। খেলাপি ঋণ আদায়ে তারা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে পরিচালন ব্যয় আরো বাড়বে, যা ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থাকে আরো চাপে ফেলতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেসিক ব্যাংকের অনুমোদিত এক হাজার ৮৩টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ৮৮৬ জন। ব্যাংকটির ষষ্ঠ, নবম ও দশম গ্রেডে মোট ২৩৭টি শূন্য পদ রয়েছে। এর মধ্যে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে ১১৯টি পদ পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই অধিকাংশ নিয়োগ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি ৪৮টি পদ চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে পূরণ করা হবে।
জানা গেছে, ইতোমধ্যে কয়েকটি পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ এবং ফল প্রকাশের কাজ চলছে। আবার কিছু পদে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির সুপারিশের অপেক্ষায় রয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বর্তমান অবস্থা কিছুটা খারাপ হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেখানে প্রয়োজনীয়তার চেয়েও অধিক জনবল রয়েছে। তবে ব্যাংকগুলোর কর্মপরিধি যদি বাড়ানো যায়, বিশেষ করে এসএমই খাতকে সক্রিয় করা হয়, তবে সেখানে প্রচুর জনবলের প্রয়োজন হবে। কারণ এই খাতে ঋণ তদারকির জন্য অনেক লোক লাগে। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রচুর ‘গ্যাপ’ বা শূন্যস্থান রয়েছে, যেগুলো বিশ্লেষণ করে খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হলো বিনিয়োগ বাড়ানো। তার জন্য বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার জন্য চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেট বন্ধ করা অপরিহার্য। বিনিয়োগ বাড়লে ব্যাংকের ঋণের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, যা বর্তমানে বেশ কম। সরকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির এই লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা উচ্চাভিলাষী হলেও, সরকার যদি আন্তরিক হয় তবে এটি অর্জন করা সম্ভব।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের বিভিন্ন গ্রেডে মোট ৬ হাজার ২৪৮টি শূন্য পদ রয়েছে। ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের চাহিদার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির মাধ্যমে অফিসার (ক্যাশ) ও সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদে এমসিকিউ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ৩২৩ জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে। এছাড়া অফিসার (রুরাল ক্রেডিট) পদে ১৩৩ জনের মৌখিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। পাশাপাশি সিনিয়র অফিসার পদে ৪০০ জন নির্বাচিত হয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। তাদের নিয়োগ ১৮০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া চলতি অর্থবছরের মধ্যেই আরো কয়েকটি নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা করেছে ব্যাংকটি।
ব্যাংকটির সূত্র জানায়, নবম গ্রেডে ১২ জনের নিয়োগ চলতি অর্থবছরেই সম্পন্ন হবে। দশম গ্রেডে ৩২০ জনকে ইতোমধ্যে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের চাহিদার ভিত্তিতে নবম গ্রেডে ৩০০ জন এবং দশম গ্রেডে ৩৩৪ জন, আর ২০২৫ সালের চাহিদার ভিত্তিতে নবম গ্রেডে ৩০০ জন এবং দশম গ্রেডে ৪০০ জন নিয়োগের প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। এসব নিয়োগ বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের মোট অনুমোদিত পদ ১৭ হাজার ৪৪৫টি। এর মধ্যে ১১ হাজার ২২৭টি পদে কর্মরত রয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বর্তমানে ৬ হাজার ২১৮টি পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া রূপালী ব্যাংকে ১ হাজার ৪৭০টি, জনতা ব্যাংকে ৩ হাজার এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ৮১০টি পদ শূন্য রয়েছে।
ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো মূলত নবম ও দশম গ্রেডে নিয়োগ দিয়ে থাকে। এসব গ্রেডের মোট শূন্য পদের ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে এবং বাকি ৫০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। জনবল নিয়োগের চাহিদা ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সরকার শূন্য পদের তথ্য চেয়েছে এবং ব্যাংকগুলো তা ইতোমধ্যে সরবরাহ করেছে।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান বলেন, আমাদের জনবল তুলনামূলক কম। তবে এ মুহূর্তে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নতুন জনবল নিয়োগে আগ্রহী নয়। কারণ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা এখনো খুব ভালো নয়। বর্তমানে আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার খেলাপি ঋণ আদায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


